আন্তর্জাতিক কার্ড লেনদেনে বাংলাদেশের অর্থপ্রবাহে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বিদেশী কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে লেনদেন হয়েছে ২৩৪ কোটি টাকা। বিপরীতে দেশীয় ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে দেশের বাইরে খরচ হয়েছে ৯৮৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ কার্ডভিত্তিক লেনদেনে দেশে আসা অর্থের তুলনায় বিদেশে গেছে প্রায় ৪ দশমিক ২ গুণ বেশি।
জুলাইয়ে দেশীয় কার্ড ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মোট ১৭ লাখ ৪৪ হাজার ৩০টি লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে ৮ লাখ ৩০ হাজার ৮৬টি লেনদেনের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫২৬ কোটি টাকা। ডেবিট কার্ডে ৭ লাখ ৯০ হাজার ১২৩টি লেনদেনে খরচ হয়েছে ৪০১ কোটি টাকা। আর প্রিপেইড কার্ডে ১ লাখ ২৩ হাজার ৮২১টি লেনদেনের মাধ্যমে দেশের বাইরে গেছে প্রায় ৫৮ কোটি টাকা।
আন্তর্জাতিক কার্ড লেনদেনে বিদেশে অর্থ ব্যয়ের এই প্রবণতার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে বিদেশ ভ্রমণ বৃদ্ধি, বিদেশে শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়, আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে পণ্য ও সেবা কেনা এবং সফটওয়্যার সাবস্ক্রিপশন ও অনলাইন বিজ্ঞাপনের মতো ডিজিটাল সেবার বিল পরিশোধে কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক উভয় পর্যায়েই কার্ডের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ছে।
অন্যদিকে বিদেশী কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। দেশের পর্যটন খাতে বিদেশী পর্যটকের সংখ্যা ও ব্যয় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না বাড়ায় এ খাত থেকে কার্ডভিত্তিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহও সীমিত থাকছে। ফলে আন্তর্জাতিক কার্ড লেনদেন এখনো বাংলাদেশের জন্য নিট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎসের চেয়ে বহিঃপ্রবাহের একটি বড় মাধ্যম হয়ে রয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে জুলাইয়ে বাংলাদেশের কার্ডধারীদের সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে—মোট আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যয়ের ১৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে ব্যয় হয়েছে ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এরপর থাইল্যান্ডে ৮ দশমিক ২৯, ভারতে ৮ দশমিক ২৬, সিঙ্গাপুরে ৬ দশমিক ১০, চীনে ৫ দশমিক ৯৬ এবং মালয়েশিয়ায় ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে। আয়ারল্যান্ডে ৫ দশমিক ৬৩, সৌদি আরবে ৫, নেদারল্যান্ডসে ৪ দশমিক ৩৫, কানাডায় ৩ দশমিক ৬৪ এবং অস্ট্রেলিয়ায় ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। অন্যান্য দেশ মিলিয়ে ব্যয়ের পরিমাণ ১৬ দশমিক ৬১ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক কার্ড লেনদেনে দেশের অর্থপ্রবাহের ভারসাম্য উন্নত করতে পর্যটন ও আন্তর্জাতিক সেবা খাতকে আরও কার্যকরভাবে সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে। বিদেশী পর্যটকদের ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সার ও অনলাইন সেবা প্রদানকারীদের বৈদেশিক আয় দেশে আনার জন্য কার্ডভিত্তিক ও ডিজিটাল চ্যানেল আরও সহজ করা গেলে অর্থপ্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
দেশের অভ্যন্তরেও কার্ড ব্যবহারের বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরে দেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২১ সালের আগস্টে ইস্যুকৃত কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৬৫ লাখ ৯৩ হাজার ৪৭৯। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৯৭-এ। একই সময়ে কার্ড লেনদেনের পরিমাণ ২২ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৪৭ হাজার ৪৮০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
কার্ডের ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও আন্তর্জাতিক লেনদেনে প্রবাহের এই ব্যবধান দেখাচ্ছে, দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণের সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সক্ষমতার সমন্বয় এখনো হয়নি। অভ্যন্তরীণভাবে কার্ড ব্যবহারের বিস্তার যেমন ভোক্তা ও ব্যবসায়িক লেনদেনকে ডিজিটাল করছে, তেমনি আন্তর্জাতিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা তৈরির একটি ক্রমবর্ধমান চ্যানেলেও পরিণত হচ্ছে।![]()