বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশ। এ ব্যবসা অধিগ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে দেশের বেসরকারি খাতের প্রথম প্রজন্মের ব্যাংক পূবালী ব্যাংক। এ নিয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী।
সোমবার রাতে তিনি বলেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ে বেশি মনোযোগ দিতে রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। পূবালী ব্যাংক এ ব্যবসা কিনতে আগ্রহী এবং ইতোমধ্যে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩ অক্টোবর দেশে ফিরে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবেন বলেও জানান তিনি।
মোহাম্মদ আলী বলেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল বা খুচরা আমানতের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। এ ব্যবসা নিয়ে কী ধরনের সমঝোতা হবে, সেটিই এখন আলোচনার মূল বিষয়।
বাংলাদেশে ব্যক্তি পর্যায়ের ব্যাংকিং সেবা দেওয়া রিটেইল ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। তবে এ ব্যবসা বিক্রি নিয়ে স্থানীয় কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা শুরুর খবর প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে পূবালী ব্যাংকই প্রথম তাদের আগ্রহের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকটির রিটেইল ও সিএমএসএমই খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। রিটেইল বা খুচরা আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রমে ব্যাংকটির আমানত প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং ঋণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল কার্যক্রমের মধ্যে প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ‘সাদিক’ নামে ইসলামিক ব্যাংকিং, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ‘স্বদেশী ব্যাংকিং’ সেবা রয়েছে। ব্যক্তিগত ঋণ, গাড়ি ও আবাসন ঋণসহ বিভিন্ন রিটেইল পণ্যও পরিচালনা করছে ব্যাংকটি।
রিটেইল ব্যাংকিং থেকে সরে যাওয়ার বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান বিটপী দাশ চৌধুরী বলেন, তারা গুঞ্জন বা জল্পনা-কল্পনার বিষয়ে মন্তব্য করেন না। তবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড গ্রুপ নিয়মিতভাবে বৈশ্বিক ব্যবসায়িক মডেলের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ ও সক্ষমতা পুনর্বিন্যাস করে।
এর আগে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দেয় এইচএসবিসি। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয় আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক। ফলে স্থানীয় বাজারে বহুজাতিক ব্যাংকগুলোর রিটেইল ব্যবসা নিয়ে কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের ধারাবাহিকতায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পূবালী ব্যাংকের জন্য স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসা অধিগ্রহণের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে উচ্চ-মূল্যের গ্রাহকভিত্তি। বহুজাতিক ও বড় দেশীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত উচ্চ বেতনের কর্মকর্তা এবং দীর্ঘদিনের প্রিমিয়াম রিটেইল গ্রাহকদের একটি বড় অংশ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে যুক্ত।
মোহাম্মদ আলীর ভাষ্য, এ ধরনের গ্রাহক পোর্টফোলিও পূবালী ব্যাংকের বিদ্যমান রিটেইল কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হলে উচ্চ-মূল্যের গ্রাহক শ্রেণিতে ব্যাংকটির অবস্থান এবং সক্রিয় গ্রাহকসংখ্যা বাড়তে পারে।
বর্তমানে পূবালী ব্যাংকের রিটেইল ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ১০ শতাংশ। পার্সোনাল লোন, হোম লোন, কার লোন ও ন্যানো লোনসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে এ খাতে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা রিটেইল ব্যাংকিংকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে বিবেচনা করছে।
সম্ভাব্য অধিগ্রহণের আর্থিক সক্ষমতার ক্ষেত্রেও পূবালী ব্যাংকের আকার গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকটির মোট সম্পদ ছিল প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ১৪ কোটি টাকা। আমানত ছিল ৮৯ হাজার ৫১৯ কোটি এবং ঋণ ও অগ্রিম ৭১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। ওই বছর কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ছিল প্রায় ১ হাজার ৮০ কোটি টাকা এবং রিটার্ন অন ইকুইটি ১৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। বছর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২ দশমিক ২০ শতাংশ।
চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে পূবালী ব্যাংকের সমন্বিত মুনাফা হয়েছে প্রায় ৬৮৫ কোটি টাকা। তবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যবসা অধিগ্রহণের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সম্পদের মূল্যায়ন, লেনদেনের কাঠামো, অর্থসংস্থান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের ওপর।
পূবালী ব্যাংকের বড় শাখা নেটওয়ার্কও সম্ভাব্য অধিগ্রহণে সুবিধা দিতে পারে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বাংলাদেশে ১৮টি শাখার বিপরীতে পূবালী ব্যাংকের শাখা ৫০০টির বেশি এবং উপশাখা ২৮০টির বেশি। ২০২৬ সালে ব্যাংকটি দেশে তাদের ১ হাজারতম এটিএম ও সিআরএম বুথ চালু করেছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের শহরকেন্দ্রিক ও প্রিমিয়াম গ্রাহকভিত্তির সঙ্গে পূবালী ব্যাংকের বিস্তৃত শাখা, উপশাখা, এটিএম ও সিআরএম নেটওয়ার্ক যুক্ত হলে বিদ্যমান গ্রাহকদের জন্য ব্যাংকিং সেবার ভৌত পরিসর বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়েও পূবালী ব্যাংক বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ‘পাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’-এর মাধ্যমে এনপিএসবি, বিইএফটিএন, আরটিজিএস, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অর্থ স্থানান্তর, বিল পরিশোধ, ক্রেডিট কার্ড এবং বাংলা কিউআরসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালের শেষে প্ল্যাটফর্মটির সক্রিয় গ্রাহক ছিল প্রায় ৫ লাখ ২৮ হাজার। ওই বছর এতে ১ কোটি ৮৬ লাখের বেশি লেনদেন হয়েছে।![]()