তারেক রিয়াজ খান
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এনআরবি ব্যাংক
প্রবাসীদের অর্থ দেশে আনা, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিস্তার এবং নিরাপদ আন্তদেশীয় লেনদেন—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে ব্যাংকিং সেবায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে এনআরবি ব্যাংক। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রিয়াজ খানের মতে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবাসী ব্যাংকিং, ক্যাশলেস লেনদেন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিধিও দ্রুত বাড়বে। বিশেষ করে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ নগদনির্ভর লেনদেন থেকে ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করবে বলে মনে করেন তিনি।
তারেক রিয়াজ খান বলেন, প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ বৈধ পথে দ্রুত ও নিরাপদে দেশে পাঠানোর জন্য এনআরবি ব্যাংক ডিজিটাল অ্যাপ এবং আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেছে। এনআরবি ক্লিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে অনাবাসী বাংলাদেশিরা ব্যাংকিং সেবা নিতে পারছেন। এরই মধ্যে বহু প্রবাসী বাংলাদেশি এই সুবিধা ব্যবহার করছেন।
প্রবাসীদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার, তাৎক্ষণিক হিসাব খোলার সুবিধা, এনআরবি ক্লিক অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসী ডিপিএস এবং প্রিমিয়াম রেমিট্যান্স ইনসেনটিভসহ বিভিন্ন সেবা চালু করেছে ব্যাংকটি। তারেক রিয়াজ খানের ভাষায়, চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহের দিক থেকে এনআরবি ব্যাংক একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, যা ব্যাংকটির অন্যতম বড় সাফল্য।
প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনতে নিরাপত্তা ও সহজ সেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি। তাঁর মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো অনুসরণ করে প্রবাসীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এনআরবি ক্লিক ব্যবহার করে বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে এনআরবি ব্যাংকের হিসাবে ব্যালেন্স দেখা, নিয়মিত হিসাব পরিচালনা এবং ডিপিএস খোলার মতো কাজ কয়েকটি ক্লিকেই করা যাচ্ছে।
রেমিট্যান্সের পাশাপাশি দেশের উৎপাদন ও কর্মসংস্থানমুখী খাতেও অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে এনআরবি ব্যাংক। রপ্তানিমুখী উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব প্রকল্প এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এমন বড় ও মাঝারি শিল্পকারখানার উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে বিশেষ নজর রয়েছে বলে জানান ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
ডিজিটাল রূপান্তরকে ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন তারেক রিয়াজ খান। তিনি বলেন, গ্রাহকের পরিবর্তিত চাহিদা, দ্রুত সেবা এবং নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন লেনদেনের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংক ডিজিটাল রূপান্তরকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দিয়েছে। প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, তথ্য ও সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং ক্যাশলেস লেনদেনের সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে আধুনিক, দক্ষ ও গ্রাহককেন্দ্রিক ব্যাংকিং পরিবেশ গড়ে তোলার কাজ চলছে।
তবে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিস্তারের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। তারেক রিয়াজ খান বলেন, ডিজিটাল আস্থার ভিত্তি হলো গ্রাহকের তথ্য, আর্থিক সম্পদ ও লেনদেনের নিরাপত্তা। এ কারণে এনআরবি ব্যাংক তথ্যনিরাপত্তা অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে আইএসও সনদ অর্জন করেছে।
ডিজিটাল পেমেন্ট ও কার্ডভিত্তিক লেনদেনের নিরাপত্তা জোরদারে পেমেন্ট কার্ড ইন্ডাস্ট্রি ডেটা সিকিউরিটি স্ট্যান্ডার্ড বা পিসিআই ডিএসএসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিরাপত্তাব্যবস্থাও অনুসরণ করছে ব্যাংকটি। সম্ভাব্য সাইবার ঝুঁকি শনাক্ত ও মোকাবিলায় তথ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়মিত পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করা হচ্ছে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা নীতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চর্চা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের আইসিটি ও নিরাপত্তা নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যালোচনা করা হয়।
ব্যাংকিং সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিজনেস কন্টিনিউটি প্ল্যান এবং আইটি ডিজাস্টার রিকভারি সক্ষমতা বজায় রাখার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং সেবা সচল রাখার প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, গ্রাহকের তথ্যের নিরাপত্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা অনুসরণ এবং তথ্যনিরাপত্তা সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগই ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ওপর আস্থা বাড়াতে পারে।
আগামী পাঁচ বছরে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও নতুন ধরনের অংশীদারত্বের ওপর জোর দিতে চায় এনআরবি ব্যাংক। তারেক রিয়াজ খান বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি অংশীদারত্ব গঠন, ক্যাশলেস ব্যাংকিং ত্বরান্বিত করা এবং দেশের খুচরা ও মাঝারি ব্যবসায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা হবে আগামী দিনের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ক্যাশলেস লেনদেনের বিস্তার শুধু ব্যাংকের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলা কিউআর ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া এবং প্রান্তিক পর্যায়ে ক্যাশলেস লেনদেন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত রোড শো ও মার্চেন্ট অনবোর্ডিং ক্যাম্পেইন পরিচালনা করছে এনআরবি ব্যাংক। এর মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
আগামী দিনের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ওপেন ব্যাংকিং এবং ফিনটেক সহযোগিতা বড় পরিবর্তন আনবে বলে মনে করেন তারেক রিয়াজ খান। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়লে গ্রাহকের ব্যয়ের ধরন বিশ্লেষণ করে তাঁর প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক পরামর্শ ও বিভিন্ন অফার দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে ব্যাংকিং সেবা আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠবে।
ক্যাশলেস অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় তরুণ প্রজন্মকে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে দেখছেন তিনি। তাঁর মতে, ডিজিটাল পদ্ধতির সঙ্গে তরুণদের দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এই রূপান্তরকে আরও ত্বরান্বিত করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের ডিজিটাল রূপান্তরের উদ্যোগও এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
তবে ক্যাশলেস অর্থনীতিতে যেতে হলে শুধু ব্যাংকের উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন তারেক রিয়াজ খান। এ জন্য ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহিত করতে প্রাথমিক পর্যায়ে ইনক্লুসিভ ইনস্ট্যান্ট পেমেন্ট সিস্টেম বা আইআইপিএস চালু, কিছু ক্ষেত্রে কর বা ভ্যাট ছাড়, গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকায় সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট অবকাঠামো নিশ্চিত করা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্যাশলেস পেমেন্ট ডিভাইস বা কিউআর কোড ব্যবহারে সরকারি নীতি সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে।
তারেক রিয়াজ খানের প্রত্যাশা, ব্যাংক, সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং প্রযুক্তি খাতের সমন্বিত উদ্যোগে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের লেনদেনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার বাড়লে একদিকে যেমন আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে, অন্যদিকে ব্যাংকিং সেবাও পৌঁছে যাবে আরও বেশি মানুষ ও ব্যবসার কাছে। তাঁর ভাষায়, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করতে পারে।
![]()