সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীর ফেলে দেয়া কঠিন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে শিল্পের কাঁচামাল ও মূল্য সংযোজিত বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। এতে জিলেটিন, শিল্প-কারখানার আঠা, পোলট্রি ফিড, জুতার সোল ও সেফটি গ্লাভসসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি বিকল্প তৈরি হবে। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব বলে জানিয়েছে বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন।
রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘ওয়াস্ট ইনটু রিসোর্স: ট্যানারি সলিড ওয়াস্ট (টিএসডব্লিউ) বাই-প্রডাক্ট অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ মডেল’ শীর্ষক নীতি সংলাপে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। বিল্ড ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব স্মৃতি কর্মকার বলেন, চামড়া শিল্পের কঠিন বর্জ্যকে সঠিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন ব্যবসা, বিনিয়োগ ও সবুজ উদ্যোক্তা তৈরির মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। সরকার রফতানি বহুমুখীকরণ, নীতি সহজীকরণ, উন্নত বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বাংলাদেশী পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে বিল্ডের চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান বলেন, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা উপজাতভিত্তিক প্রকল্পে পুঁজি বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তীব্র ঘাটতির মুখে পড়ছেন। এ সমস্যা সমাধানে নীতিপ্রণয়ন ও বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৯০-১০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ১১ ধরনের পণ্য আমদানি করে, যা ট্যানারির ফেলে দেয়া চামড়ার উপজাত থেকে দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব।
বিল্ডের সিইওর তথ্য অনুযায়ী, সাভারের বিসিক ট্যানারি শিল্পনগরীর ১৫০টি সচল কারখানা থেকে বছরে প্রায় ৮৪ হাজার টন কঠিন বর্জ্য উৎপাদন হয়। এর প্রায় ৬৪ শতাংশ ক্রোমিয়ামমুক্ত বর্জ্য। তবে যথাযথ পৃথক্করণ ও প্রক্রিয়াজাত ব্যবস্থার অভাবে এসব বর্জ্যের ৮৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ অপচয় হচ্ছে। বর্জ্য থেকে জেলাটিন, টেলো, আঠা ও ফিড অ্যাডিটিভসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।
তবে পরিবেশগত ছাড়পত্র, পণ্যের মানসনদ, বর্জ্য পৃথক্করণ এবং আইনি স্বীকৃতির ঘাটতি এ খাতের বিকাশে বড় বাধা বলে সংলাপে উল্লেখ করা হয়। এ জন্য ট্যানারি বর্জ্যকে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে স্বীকৃতি, নীতিসহায়তা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুপারিশ করেন ফেরদৌস আরা বেগম।
ইউনিডোর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ আলমগীর হোসেন বলেন, বাংলাদেশ যখন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছে, তখন নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চামড়া শিল্পকে বিকল্প প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
বিসিকের পরিচালক (শিল্প উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ) কাজী নজরুল ইসলাম বলেন, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পরিবার, অফিস, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থাকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি মাস্টার অ্যাকশন প্ল্যান ও ডেডিকেটেড কো-অর্ডিনেশন কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ চামড়া শিল্পের কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় ও কমপ্লায়েন্সের ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি উৎস পর্যায়ে কাঁচামালের মানোন্নয়নে কসাইখানাগুলো সচল করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
ডিটিআইডব্লিউটিপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম শাহনেওয়াজ জানান, দেশে বছরে ৫০০-৭০০ কোটি ক্যাপসুলের অভ্যন্তরীণ বাজার রয়েছে। এসব ক্যাপসুল উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ জিলেটিনের প্রয়োজন হয়। এ চাহিদা পূরণে অবিলম্বে কঠিন বর্জ্যনীতি প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান ট্যানারি বর্জ্যের শ্রেণীবিন্যাসের সমস্যা সমাধানে ‘জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন’-এর মতো ডেডিকেটেড প্রসেসিং কারখানা স্থাপনের প্রস্তাব দেন। তিনি জানান, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কোনো কারখানাই বর্তমানে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের সার্টিফিকেশন পায়নি। পুরনো নীতিমালায় শিল্পনগরীর ভেতরে পৃথক ইটিপি স্থাপনের সুযোগ না থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দ্রুত কেন্দ্রীয় সিইটিপি স্থাপন ও এলডব্লিউজি সার্টিফিকেশনের জন্য পাইলট প্রকল্প চালুর দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি টিপু সুলতান বলেন, সিইটিপি অকার্যকর থাকায় আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় নির্মাতাদের বৈশ্বিক ফ্যাশন ট্রেন্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ের কসাইখানা থেকে কাঁচা চামড়ার ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
নীতি সংলাপে আরো বক্তব্য রাখেন প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইশরাত শবনম, এশিয়া ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ প্রজেক্ট ম্যানেজার সাজ্জাদ হোসেন খান এবং প্রোগ্রাম ডিরেক্টর আইনী ইসলাম।![]()