দেশে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য স্বস্তিদায়ক ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বিপুল পরিমাণ বৈশ্বিক মূলধন আসবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক) তানভীর শাহরিয়ার গনি। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত অর্থায়নে পুঁজিবাজারকে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) মিলনায়তনে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি: নিরীক্ষা, প্রতিবেদন প্রণয়ন, সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পেশাজীবী সংস্থাগুলোর ভূমিকা’ শীর্ষক এ সম্মেলনের আয়োজন করে আইসিএবি, আইসিএমএবি, আইসিএসবি, আইআইএবি ও এসিসিএ।
তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, দেশের বিশাল উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত চাহিদা পূরণে এখন আর ৫-১০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ২৫, ৫০ কিংবা ১০০ বিলিয়ন ডলারের মতো বড় অংকের মূলধন। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষে একবারে এ ধরনের বিপুল অর্থায়ন করা সম্ভব নয়। তাই দীর্ঘমেয়াদি অর্থসংস্থানের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মূলধন অত্যন্ত গতিশীল, একই সঙ্গে সতর্কও। বিনিয়োগকারীদের মূলধন সুরক্ষিত রাখতে আর্থিক প্রতিবেদনে শতভাগ সততা ও গ্রহণযোগ্য মান বজায় রাখা জরুরি।
আর্থিক প্রতিবেদনে অসত্য তথ্য থাকলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি ও দেশের ওপরও পড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তানভীর গনি বলেন, ভিয়েতনামে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির পর বিপুল বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে। বাংলাদেশেও প্রয়োজনীয় স্বস্তি নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আসবে।
বাংলাদেশে আইসিএবি, আইসিএমএবি ও এসিসিএর মতো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন শুধু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড গ্রহণ করলেই হবে না, সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
দেশব্যাপী আর্থিক সাক্ষরতা বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তানভীর গনি। তিনি বলেন, বিএসইসি বর্তমানে পুরো দেশে আর্থিক সাক্ষরতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে, যা আগামী পাঁচ বছরে অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। শুধু সংস্কার প্রস্তাব করলেই হবে না, কাজের মান বাড়ানোর পাশাপাশি ডিজিটাইজেশনও বাস্তবায়ন করতে হবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি ব্যবস্থায় পরিবর্তনের কথাও জানান তিনি। এলোমেলোভাবে ফাইল ধরে অনুসন্ধানের পরিবর্তে সিস্টেমভিত্তিক ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি বা রিস্ক-বেজড সুপারভিশন চালুর উদ্যোগের কথা বলেন তিনি।
পুঁজিবাজারের পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তানভীর শাহরিয়ার গনি। তিনি বলেন, বাজেট প্রণয়নের সময় অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি ও এনবিআরের সমন্বয়ে একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি করে কাজ করা হয়েছে। নীতিমালা ও ঢাকাকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ঠিক করা গেলে বাংলাদেশ সঠিকভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, বর্তমান জটিল যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার কারণে আইপিও অনুমোদনে বেশি সময় লাগছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন হলে তিন মাসের মধ্যে আইপিও অনুমোদন দেয়া সম্ভব হবে।
অডিটরদের পেশাগত নৈতিকতা মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, অডিট ফি নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করা হবে। তা বাস্তবায়নের পর নিয়ম ভেঙে কম ফি নেয়া অডিটরদের বিরুদ্ধে বিএসইসি কঠোর অবস্থান নেবে। পাশাপাশি অডিটর তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
করপোরেট গভর্ন্যান্সের গুরুত্ব তুলে ধরে মাসুদ খান বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী সুশাসনই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি সুশাসনের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে। এ কারণে বিএসইসি করপোরেট গভর্ন্যান্স গাইডলাইন পুনর্গঠনের কাজ করছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্বের জন্য কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আইসিএবির প্রেসিডেন্ট সাব্বীর আহমেদ এফসিএ, ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফুর রহমান এফসিএ, আইসিএমএবির প্রেসিডেন্ট কাউসার আলম এফসিএমএ, এসিসিএর কান্ট্রি ম্যানেজার প্রমা খান এফসিসিএ, আইআইএবির প্রেসিডেন্ট এম. নুরুল আলম এফসিএস এবং আইসিএসবির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শাহজাহান এফসিএসসহ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।![]()