বন্দর অবকাঠামো, বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনাল প্রকল্পে ৮০ কোটি থেকে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগোচ্ছে। আগামী বছরের মধ্যে চুক্তিটি চূড়ান্ত করার প্রত্যাশা রয়েছে দুই দেশের।
তবে বিনিয়োগের এ সম্ভাবনার বিপরীতে বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো সীমিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের পুঞ্জীভূত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪৪ কোটি ৮০ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। অন্যদিকে, সিঙ্গাপুরের পরিসংখ্যান দপ্তর সিংস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে এশিয়ায় দেশটির প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের স্থিতি ছিল ৮৬ হাজার ৬০০ কোটি সিঙ্গাপুর ডলার। দুই হিসাবের সময়কাল ও মুদ্রা ভিন্ন হলেও সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে।
ঢাকায় সিঙ্গাপুর হাইকমিশনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ফিলিপ ওং বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় সিঙ্গাপুরের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার বাংলাদেশ। দুই দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের স্থিতি ছিল ৩০০ কোটি সিঙ্গাপুর ডলারের কিছু বেশি। ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্যবাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩৯০ কোটি সিঙ্গাপুর ডলার।
সেম্বকর্প, পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল, সারবানা জুরং ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণে আগ্রহী বলে জানান ফিলিপ ওং। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বে টার্মিনাল প্রকল্প সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। প্রকল্পটিতে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ ৮০ কোটি থেকে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার হতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো ও বাণিজ্য অবকাঠামো আধুনিকায়নে বে টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রকল্পটির আওতায় প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রেকওয়াটার নির্মাণ, ড্রেজিং, একটি বহুমুখী টার্মিনাল এবং দুটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি হতে পারে। এটি এখনো উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে।
বন্দর কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়লে পণ্য খালাসে বিলম্বজনিত অতিরিক্ত মাশুল কমানো এবং জাহাজ চলাচলের সময় সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে। এতে আমদানি-রফতানিকারকদের ব্যয় কমার পাশাপাশি বাংলাদেশের সরবরাহব্যবস্থার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবেও দেশের আকর্ষণ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
বন্দর অবকাঠামোর বাইরে বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নেও আগ্রহ রয়েছে সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠানগুলোর। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের চলতি বছরের মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরের যাত্রীসংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থা এবং উড়োজাহাজ চলাচল থেকে আয় ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে আগ্রহ দেখিয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ক্রিমসন ও এন্টারপ্রাইজ। পর্যটন খাতেও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
ডিজিটাল অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবায়ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ দেখছে সিঙ্গাপুর। ফিলিপ ওং বলেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্যে বহুমুখীকরণ, খাদ্যনিরাপত্তায় সহযোগিতা এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে সিঙ্গাপুর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। সিঙ্গাপুরভিত্তিক সেম্বকর্পের ৭১ শতাংশ মালিকানাধীন যৌথ উদ্যোগের আওতায় সিরাজগঞ্জে ৪১৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। সেম্বকর্প নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের এ কেন্দ্রটি ২০১৯ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। আর্থিক সেবা খাতেও দেশটির উপস্থিতি রয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ডিবিএস ব্যাংক ২০২৩ সালে ঢাকায় প্রতিনিধি কার্যালয় চালু করে। তবে প্রতিনিধি কার্যালয়ের কার্যক্রমকে সরাসরি ব্যাংক খাতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করা যায় না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের পুঞ্জীভূত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে, ১১৩ কোটি ৯ লাখ মার্কিন ডলার। টেলিযোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ ২৩ কোটি ৪৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার, টেক্সটাইল ও পোশাক খাতে ২২ কোটি ৫ লাখ ডলার এবং কৃষি ও মৎস্য খাতে ১৫ কোটি ৪৫ লাখ ১০ হাজার ডলার। ব্যাংক খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৭০ লাখ ২০ হাজার ডলার।
আঞ্চলিক তুলনায়ও বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগের পরিমাণ কম। সিংস্ট্যাটের ২০২৪ সালের শেষের হিসাব অনুযায়ী, ভারতে সিঙ্গাপুরের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের স্থিতি ছিল ১ হাজার ২২৬ কোটি ৪০ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার এবং ইন্দোনেশিয়ায় ১ হাজার ৪২ কোটি ৯০ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার। তবে এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিনিয়োগের তুলনা করতে হলে একই সময়কাল ও একই মুদ্রায় হিসাব করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বাইরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বিস্তৃত। ভারতের এয়ার ইন্ডিয়া গ্রুপে ২০২৪ সালে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের ২৫ দশমিক ১ শতাংশ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইন্দোনেশিয়ায় সেম্বকর্প ও পিএলএন নুসান্তারা পাওয়ার ২০২৫ সালে ৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ এবং ১৪ দশমিক ২ মেগাওয়াট-ঘণ্টা সক্ষমতার ব্যাটারিভিত্তিক বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রকল্প চালু করে।
বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ের উৎস হিসেবেও সিঙ্গাপুর বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেশভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সিঙ্গাপুর থেকে প্রবাসী আয় এসেছে ১৪৯ কোটি ৩৯ লাখ মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। এ সময়ে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের উৎস হিসেবে সিঙ্গাপুরের অবস্থান ছিল অষ্টম।
দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারণে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত চুক্তি নিয়ে সমঝোতা ও দরকষাকষির তৃতীয় দফা আলোচনা শেষ হয়েছে। গত ১১ আগস্ট সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণানের বৈঠক শেষে দুই পক্ষ দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করার প্রত্যাশা জানায়। ৩০ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ও বাংলাদেশকে এফটিএ নিয়ে আলোচনাধীন অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে পণ্য ও সেবাবাণিজ্যে বাজারে প্রবেশাধিকার, শুল্কসুবিধা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরির সুযোগ থাকে। তবে বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর চুক্তির শর্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে বাংলাদেশের কোন পণ্য কতটা শুল্কসুবিধা পাবে কিংবা বিনিয়োগকারীরা কী ধরনের সুনির্দিষ্ট সুবিধা পাবেন, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
অর্থনীতি ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৭ সালে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫৫ বছর পূর্ণ হবে। দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী আয় দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন বিনিয়োগের আগ্রহকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়া। বে টার্মিনাল ও বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার মতো অবকাঠামো প্রকল্পে কার্যকর অগ্রগতি, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কমানো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এফটিএর আলোচনা সফলভাবে শেষ হলে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।![]()