বিদেশি বিনিয়োগ মানে শুধু টাকা নয় একই সাথে নলেজ ও টেকনোলজি ট্রান্সফার: সৈয়দ এরশাদ আহমেদ
সৈয়দ এরশাদ আহমেদ
সদ্য সাবেক সভাপতি, অ্যামচাম
রাজু আলীম
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ, বহুজাতিক ব্যবসা এবং বাণিজ্যিক নীতি-সংলাপের জগতে কয়েক দশক ধরে পরিচিত একটি নাম সৈয়দ এরশাদ আহমেদ। তিনি শুধু একজন করপোরেট নির্বাহী নন, বরং এমন একজন সংগঠক, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ, বাংলাদেশের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচাম)-এর সাবেক সভাপতি হিসেবে তিনি এমন এক সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যখন বাংলাদেশকে একই সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়েছে বৈশ্বিক মহামারি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ।
অ্যামচামের সঙ্গে সৈয়দ এরশাদ আহমেদের সম্পর্ক নতুন নয়। সংগঠনটির ইতিহাসের সঙ্গে তিনি প্রায় শুরু থেকেই যুক্ত। তাঁর ভাষায়, অ্যামচামের আনুষ্ঠানিক যাত্রা ১৯৯৬ সালে শুরু হলেও এর বীজ রোপিত হয়েছিল আরও প্রায় এক দশক আগে, আমেরিকান-বাংলাদেশ ইকোনমিক চেম্বারের মাধ্যমে। তিনি স্মরণ করেন, তৎকালীন সিঙ্গারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব জামিল এবং ফাইজারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ হুমায়ুন কবির ছিলেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠার প্রধান স্থপতিদের মধ্যে অন্যতম। সেই সূচনালগ্নের প্রথম বোর্ডের সদস্য হিসেবেও কাজ করার সুযোগ হয়েছিল তাঁর।
এই দীর্ঘ পথচলা তাঁকে শুধু একজন সংগঠক নয়, বরং বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের বিবর্তনের প্রত্যক্ষ সাক্ষীতে পরিণত করেছে। তাঁর মতে, অ্যামচাম যখন যাত্রা শুরু করে, তখন বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল মিলিয়ন ডলারের ঘরে। আজ সেই পরিমাণ ১১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এই অগ্রযাত্রার পেছনে নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সংগঠনগুলোর অবদানও কম নয় বলে তিনি মনে করেন।
সৈয়দ এরশাদ আহমেদের নেতৃত্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল সংকটের মধ্যেও প্রতিষ্ঠানকে সচল রাখা। তিনি একবার অ্যামচামের সভাপতি ছিলেন ২০০৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে, যখন দেশে জরুরি অবস্থা জারি ছিল এবং ব্যবসা-বাণিজ্য অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। পরে আবার সভাপতি হন ২০১৯ সালের শেষ দিকে। সেই দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিন পরই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে কোভিড-১৯ মহামারি।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “লাস্ট ছয় বছর খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। ২০২০ সালের শুরু থেকেই আমাদের শুরু হয়ে গেল প্যান্ডেমিক। দুই বছর আমরা কোভিডের কারণে অনেক কিছু করতে পারিনি। কিন্তু অ্যামচাম কখনো পিছিয়ে পড়েনি।”
মহামারির সময়ে যখন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম সীমিত করতে বাধ্য হয়েছিল, তখন অ্যামচাম ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত সংলাপ, নীতি আলোচনা এবং সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। সাংবাদিকদের জন্য পুরস্কার, কৃষকদের জন্য স্বীকৃতি এবং বিভিন্ন খাতভিত্তিক আলোচনা অব্যাহত রাখার বিষয়টিকে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তাঁর নেতৃত্বে অ্যামচামের প্রকাশনা ও গবেষণা কার্যক্রমও নতুন মাত্রা পায়। সংগঠনের জার্নালকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং আইএসএসএন নম্বর অর্জনের উদ্যোগ ছিল সেই প্রচেষ্টার অংশ।
তবে নিজের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে তিনি কোনো অনুষ্ঠান বা নীতিগত সাফল্যের কথা বলেন না। তিনি গুরুত্ব দেন নেতৃত্ব তৈরির বিষয়টিকে। তাঁর ভাষায়, “আমি লিডারশিপ তৈরির পিছনে জোর দিয়েছিলাম, যাতে ভবিষ্যতে একটা লিগ্যাসি তৈরি হয়ে যায়। আজ আমি খুশি যে নতুন অনেক মানুষ তৈরি হয়েছে, যারা ভবিষ্যতে অ্যামচামের দায়িত্ব নিতে পারবে।”
বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনায় সৈয়দ এরশাদ আহমেদের অবস্থান বরাবরই স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য বিদেশি বিনিয়োগ কোনো বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য প্রয়োজন। বিশেষ করে অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং শিল্পোন্নয়নের মতো খাতে বড় বিনিয়োগের বিকল্প নেই।
তাঁর মতে, বিদেশি বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় সুবিধা শুধু মূলধন নয়। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তর, জ্ঞান বিনিময়, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং উৎপাদনের মানোন্নয়ন ঘটে। তিনি বলেন, “বিদেশি বিনিয়োগ হলে শুধু টাকা আসে না। নলেজ ট্রান্সফার হয়, টেকনোলজি ট্রান্সফার হয়, স্কিল ডেভেলপমেন্ট হয়। আজকে বাংলাদেশের অনেক বড় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে যারা আছেন, তাদের অনেকেই একসময় বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন।”
তবে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পথে বাংলাদেশের বেশ কিছু দীর্ঘস্থায়ী বাধার কথাও বারবার তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি। দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, যা নতুন বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “দুর্নীতির কারণে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ি। বাংলাদেশের একটা বদনাম আছে বাইরে যে আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। এই ইমেজ থেকে যদি বের হতে না পারি, তাহলে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে।”
তাঁর আরেকটি বড় উদ্বেগ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন বাংলাদেশে আসেন, তখন অনুমোদন, লাইসেন্স এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়েন। এই অভিজ্ঞতা অনেক সময় সম্ভাবনাময় বিনিয়োগকেও অন্য দেশে সরিয়ে দেয়।
একটি উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি স্মরণ করেন, একসময় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং বাংলাদেশে উৎপাদন কারখানা স্থাপনের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় পর্যায়ে যথাযথ সাড়া না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি শেষ পর্যন্ত ভিয়েতনামে চলে যায়। তাঁর মতে, এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি বড় হারানো সুযোগ।
বিদেশি বিনিয়োগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও কথা বলেছেন সৈয়দ এরশাদ আহমেদ। তিনি মনে করেন, দেশে এখনো অনেকের মধ্যে ধারণা রয়েছে যে বিদেশি কোম্পানি শুধু মুনাফা নিয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, স্থানীয় শিল্পের মান উন্নত হয় এবং দক্ষ কর্মী তৈরি হয়।
অ্যামচামের নেতৃত্বে থাকার সময় তিনি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত নীতিগত সুপারিশ তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অর্থ, বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে অংশ নিয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির পক্ষে মত দিয়েছেন। বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়াতেও অ্যামচামের পক্ষ থেকে সুপারিশ প্রদান করা হয়, যার একটি অংশ সরকার গ্রহণ করেছে।
তিনি মনে করেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে শুধু কর-সুবিধা দিলেই হবে না। ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে হবে এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন লজিস্টিকস খাতের ওপর। তাঁর মতে, বাংলাদেশে একটি সমন্বিত লজিস্টিকস কৌশল বহুদিন ধরেই প্রয়োজন। সরকার নীতিমালা অনুমোদন করলেও বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে দেশ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারাচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমদানি-রপ্তানিতে বেশি সময় লাগে। এই লিড টাইম কমাতে না পারলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা কঠিন হবে।”
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়েও তাঁর চিন্তা গভীর। বাজেট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বারবার বলেছেন, শুধু অবকাঠামো নয়, মানুষের ওপর বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের দক্ষতা, মর্যাদা এবং আর্থিক অবস্থার উন্নয়নকে তিনি জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে দেখেন।
তাঁর ভাষায়, “প্রাথমিক পর্যায়ে যদি শিক্ষার্থীদের ঠিকভাবে গড়ে তোলা না যায়, তাহলে পরবর্তীতে তাদের উন্নয়ন করা কঠিন হয়ে যায়। তাই শিক্ষকতার মান উন্নয়নে বিনিয়োগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
অ্যামচামের ভবিষ্যৎ নিয়েও তিনি আশাবাদী। দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় তিনি নতুন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে বলেন, গবেষণা, তথ্যভিত্তিক নীতি বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে সংগঠনটি আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা অ্যামচাম নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে নতুন বিনিয়োগ আনার সম্ভাবনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম কিংবা অন্যান্য দেশের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তবে সবকিছুর কেন্দ্রে তিনি রাখেন দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশকে। তাঁর মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হলে দুর্নীতি কমানো, আইনের শাসন নিশ্চিত করা, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা জোরদার করা এবং শ্রম ও নিরাপত্তা মান উন্নত করা জরুরি।
সৈয়দ এরশাদ আহমেদের দীর্ঘ কর্মজীবন মূলত একটি বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—বাংলাদেশের সম্ভাবনা বিশাল, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দক্ষ মানবসম্পদ এবং আন্তর্জাতিক আস্থার সমন্বয় প্রয়োজন। অ্যামচামের সাবেক সভাপতি হিসেবে তাঁর বক্তব্য, উদ্যোগ এবং নেতৃত্ব সেই লক্ষ্য অর্জনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টারই প্রতিফলন।
বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে এগোচ্ছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে, তখন সৈয়দ এরশাদ আহমেদের মতো অভিজ্ঞ ব্যবসায়িক নেতাদের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ তিনি শুধু একজন করপোরেট নির্বাহী নন; তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব