অবশেষে প্রাপ্য মর্যাদায় আহসান হাবীব
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নতুন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হলেন আয়কর ক্যাডারের অত্যন্ত মেধাবী ও সৎ কর্মকর্তা আহসান হাবীব, যিনি ব্যক্তিগতভাবে আমার অতি ঘনিষ্ঠ একজন মানুষ। দীর্ঘদিন পর আয়কর ক্যাডারের একজন মেধাবী কর্মকর্তা এনবিআরের শীর্ষ পদ পদে নিয়োগ পেলেন। আজ তাঁর এই মূল্যায়নে আমার আনন্দ ও আবেগ প্রকাশের ভাষা নেই। যাঁরা ক্ষমতার দাপটের কাছে মাথা নত করেন না, তাঁদের পথ কতটা কঠিন হয়, তা আমি আর আহসান হাবীব খুব ভালো করেই জানি। দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনামলে শেখ হাসিনার তৎকালীন অত্যন্ত ক্ষমতাধর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমানের (যিনি সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান ছিলেন) চরম ব্যক্তিগত আক্রোশ, প্রতিহিংসা এবং সুপরিকল্পিত হয়রানির শিকার হয়েছিলেন তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার আহসান হাবীব। ঠিক একইভাবে, পেশাগত সততার অপরাধে নজিবুর রহমানের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে যমুনা গ্রুপের ‘দৈনিক যুগান্তর’-এর চাকরি হারিয়ে চরম লাঞ্ছনা ও ক্যারিয়ার ধ্বংসের মুখোমুখি হতে হয়েছিল আমাকেও। নজিবুর রহমানের সেই কুৎসিত আক্রোশ ও ক্ষমতার দাপটের কারণে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমি আর কোথাও চাকরি করতে পারিনি এবং দীর্ঘ সময় আমাকে আমার প্রাণের পেশা সাংবাদিকতা থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল। নজিবুর রহমানের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া ও সুদৃঢ় প্রতিবাদ করায় অসাধারণ মেধা থাকা সত্ত্বেও আহসান হাবীব ভাইকে দীর্ঘদিন পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও প্রাপ্য মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। ১৫তম বিসিএস (ট্যাক্সেশন) ক্যাডারের দেশসেরা টপার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়া এই অসাধারণ মেধাবী কর্মকর্তাকে প্রশাসনিকভাবে চরম হেনস্তা করা হয়। কর ফাঁকি, বড় বড় আর্থিক অনিয়ম ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কারণেই তিনি তৎকালীন ক্ষমতাবান প্রশাসনিক বলয়ের তীব্র বিরাগভাজন হন বলে ব্যাপকভাবে আলোচিত ছিল। নজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হওয়ার পর ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহার করে আহসান হাবীব ভাইয়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা ফাইল তৈরি করে তাঁর ক্যারিয়ার পুরোপুরি ধ্বংস করার নীল নকশা এঁকেছিলেন। ঠিক একইভাবে, সাংবাদিক হিসেবে আমি যখন আমার পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এই দুর্নীতিবাজ চক্রের মুখোশ উন্মোচন করতে চেয়েছিলাম, তখন নজিবুর রহমানের সরাসরি আক্রোশের মুখে পড়তে হয় আমাকে। নজিবুর রহমানের প্রচণ্ড চাপ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভয়ের কাছে নতিস্বীকার করে যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান আমাকে যুগান্তরের চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে বাধ্য হন। শুধু তাই নয়, আমি যেন অন্য কোনো গণমাধ্যমে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারি বা কোনো চাকরিতে প্রবেশ করতে না পারি, সেজন্য সুপরিকল্পিতভাবে আমার সমস্ত পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। দেখুন প্রকৃতির অমোঘ বিচার। ক্ষমতার নির্মম অপব্যবহারকারী সেই নজিবুর রহমান আজ গণহত্যা আর দুর্নীতির দায়ে কারাগারে বন্দি। সপরিবারে বিদেশযাত্রা নিষিদ্ধ। সকল সম্পত্তি জব্দ করা হচ্ছে। নিজের ও সন্তানের নামে অবৈধভাবে অর্থ ও বিপুল অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা এই সাবেক শীর্ষ আমলা আজ কারাগারের চার দেয়ালের পেছনে এক চরম অপমানজনক ও অন্ধকার জীবন-যাপন করছেন। আর অন্যদিকে, নিয়তির অমোঘ বিচারে সব অন্যায়, বঞ্চনা আর প্রতিহিংসার জাল ছিন্নভিন্ন করে আজ সেই সৎ, দক্ষ ও আপসহীন কর্মকর্তা আহসান হাবীব দেশের রাজস্ব প্রশাসনের সর্বোচ্চ আসন এনবিআরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব! একেই বলে সময়ের নির্মম সমীকরণ এবং প্রকৃতির আসল বিচার!