বাংলা কিউআরের নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য
রিয়াজুল ইসলাম
ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত)
এবি ব্যাংক পিএলসি
বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি দ্রুত বাড়ছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও বিভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট সেবার প্রসারের ফলে নগদ অর্থের বিকল্প হিসেবে প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন এখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের ধারাকে আরও সমন্বিত ও কার্যকর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক চালু করেছে ‘বাংলা কিউআর’—একটি জাতীয় আন্তঃপরিচালনযোগ্য (ইন্টারঅপারেবল) কিউআরভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে একটি মাত্র কিউআর কোড ব্যবহার করেই বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং অনুমোদিত পেমেন্ট সেবাদাতার গ্রাহকরা একই মার্চেন্টকে অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন।
এবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) রিয়াজুল ইসলাম মনে করেন, বাংলা কিউআর শুধু একটি নতুন প্রযুক্তি নয়; এটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ক্যাশলেস ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। তার ভাষায়, ব্যাংকের লক্ষ্য শুধু কিউআর বিতরণ করা নয়, বরং এর নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করা।
রিয়াজুল ইসলাম বলেন, বাংলা কিউআরের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি একটি একক, আন্তঃপরিচালনযোগ্য এবং স্বল্পব্যয়ী পেমেন্ট অবকাঠামো। আগে একজন গ্রাহককে বিভিন্ন ব্যাংক বা এমএফএসের জন্য আলাদা আলাদা কিউআর ব্যবহার করতে হতো। এখন একটি বাংলা কিউআর স্ক্যান করেই অংশগ্রহণকারী সব প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন। ফলে গ্রাহকের জন্য পেমেন্ট প্রক্রিয়া হবে আরও সহজ, দ্রুত ও ঝামেলামুক্ত।
তিনি বলেন, এর সবচেয়ে বড় সুবিধা শুধু গ্রাহকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যবসায়ীরাও একটি মাত্র কিউআরের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএসের গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করতে পারবেন। এতে একাধিক কিউআর প্রদর্শনের প্রয়োজন থাকবে না, হিসাব ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে। নগদ অর্থ সংরক্ষণ, খুচরা টাকা রাখা কিংবা প্রতিদিন নগদ অর্থ ব্যাংকে জমা দেওয়ার মতো ঝামেলাও অনেকাংশে কমে আসবে।
তার মতে, ক্ষুদ্র ও মাইক্রো ব্যবসায়ীদের জন্য বাংলা কিউআর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তাদের অধিকাংশের পক্ষে পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) মেশিন কেনা বা রক্ষণাবেক্ষণ করা ব্যয়বহুল। বাংলা কিউআরের ক্ষেত্রে শুধু একটি কিউআর স্টিকার থাকলেই ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করা সম্ভব। ফলে অল্প বিনিয়োগেই তারা আধুনিক ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন।
রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আরেকটি বড় সুবিধা হলো প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হবে। এর মাধ্যমে ব্যবসার স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে ব্যাংক ঋণ, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল, ট্রেড ফাইন্যান্স কিংবা অন্যান্য আর্থিক সেবা পাওয়াও সহজ হবে। অনেক ছোট ব্যবসা আগে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থাকলেও ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস তাদের আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও নিশ্চিত করেছে। ফলে বিক্রির অর্থ দ্রুত ব্যবসায়ীর হিসাবে জমা হবে, যা তাদের দৈনন্দিন নগদ প্রবাহ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ব্যাংকের দৃষ্টিকোণ থেকেও বাংলা কিউআর একটি বড় সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করেন এবি ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, আগে একটি ব্যাংকের ডিজিটাল সেবার পরিধি মূলত নিজস্ব গ্রাহকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বাংলা কিউআরের মাধ্যমে একটি ব্যাংক বৃহত্তর জাতীয় পেমেন্ট নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে উঠবে। এর ফলে নতুন মার্চেন্ট যুক্ত হবে, ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ বাড়বে, আমানত প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং তথ্যভিত্তিক নতুন আর্থিক সেবা চালুর সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে এই ডিজিটাল তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আরও সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, ব্যবসায়িক বিশ্লেষণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক আর্থিক পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ বাংলা কিউআর কেবল একটি পেমেন্ট মাধ্যম নয়; এটি ব্যাংকিং খাতের ডিজিটাল ব্যবসা সম্প্রসারণের নতুন ভিত্তি।
বাংলা কিউআরের মাধ্যমে কি সব ব্যাংক, এমএফএস এবং পেমেন্ট সেবাদাতার মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করা সম্ভব হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, বাংলা কিউআরের মূল উদ্দেশ্যই হলো একটি কিউআরের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী সব প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের সুযোগ তৈরি করা। বাংলাদেশ ব্যাংক এটিকে একটি ওপেন-লুপ জাতীয় মান হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক হিসাব, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, প্রিপেইড কার্ড, এমএফএস অ্যাকাউন্ট এবং অনুমোদিত ই-ওয়ালেটসহ বিভিন্ন পেমেন্ট ইনস্ট্রুমেন্ট থেকে অর্থ পরিশোধ করা যাবে।
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, বাস্তবে এ সুবিধা পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তিগতভাবে বাংলা কিউআর নেটওয়ার্কে সংযুক্ত এবং সার্টিফায়েড হতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সংযোগ অসম্পূর্ণ থাকলে, গ্রাহকের অ্যাপে বাংলা কিউআর ফিচার সক্রিয় না থাকলে অথবা সাময়িক নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে কিছু সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। তবে এগুলো প্রযুক্তির মৌলিক সমস্যা নয়; বরং বাস্তবায়নের অংশ। যত বেশি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হবে, বাংলা কিউআর তত বেশি সর্বজনীন হয়ে উঠবে।
বাংলা কিউআরের মূল লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি দেশের জন্য একটি নিরাপদ, সহজ, একীভূত এবং আন্তঃপরিচালনযোগ্য ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ। এর মাধ্যমে গ্রাহক কোন ব্যাংক বা এমএফএস ব্যবহার করছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ থাকবে না; একটি কিউআর দিয়েই অর্থ পরিশোধ করা যাবে।
তিনি মনে করেন, নগদ অর্থের ব্যবহার একদিনে কমে যাবে—এমনটি প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, যখন ডিজিটাল পেমেন্ট সহজ, দ্রুত এবং সর্বজনগ্রাহ্য হয়, তখন ধীরে ধীরে নগদের ব্যবহার কমতে শুরু করে। বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ছোট অঙ্কের দৈনন্দিন লেনদেন ডিজিটাল হবে, নগদ বহনের প্রয়োজন কমবে এবং আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে দেশের ক্যাশলেস অর্থনীতি গঠনের ভিত্তিও আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলা কিউআর বাস্তবায়নে এবি ব্যাংকের প্রস্তুতি সম্পর্কে রিয়াজুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও কার্যক্রমগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপে বাংলা কিউআর সম্পূর্ণভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে। বিদ্যমান মার্চেন্ট কিউআরগুলোকে ধাপে ধাপে বাংলা কিউআরে রূপান্তরের কাজ চলছে। একই সঙ্গে নতুন মার্চেন্ট অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়াও আরও সহজ ও দ্রুত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু প্রযুক্তি প্রস্তুত করলেই হবে না; গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রধান কার্যালয় থেকে শুরু করে শাখা পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল ব্যাংকিং বিভাগ এবং ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। মার্চেন্টদের প্রশিক্ষণ, ব্যবহারবিধি, গ্রাহক সহায়তা এবং নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, রিয়েল-টাইম মনিটরিং, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ফ্রড ডিটেকশন ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
কিউআরভিত্তিক প্রতারণার ঝুঁকি নিয়ে তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাংলা কিউআর বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রতিটি কিউআর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত জাতীয় মান অনুযায়ী তৈরি এবং নিবন্ধিত মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে অর্থ সরাসরি গ্রাহকের হিসাব থেকে মার্চেন্টের নিবন্ধিত হিসাবে চলে যায়। মাঝপথে কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি অর্থ গ্রহণের সুযোগ নেই।
তার ভাষায়, ব্যাংকগুলো রিয়েল-টাইম ট্রানজ্যাকশন মনিটরিং, ফ্রড ডিটেকশন, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপে পিন, অথেনটিকেশন এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও চালু রয়েছে। তবে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি গ্রাহকের সচেতনতা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রাহকদের উদ্দেশে তিনি পরামর্শ দেন, সব সময় অনুমোদিত বাংলা কিউআর ব্যবহার করতে হবে। অর্থ পরিশোধের আগে অবশ্যই মার্চেন্টের নাম এবং টাকার পরিমাণ যাচাই করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই ওটিপি, পিন বা পাসওয়ার্ড অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না। সন্দেহজনক বা পরিবর্তিত কিউআর স্টিকার ব্যবহার না করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জানাতে হবে। লেনদেন শেষে অ্যাপের কনফারমেশন এবং ট্রানজ্যাকশন রসিদ দেখে নিশ্চিত হতে হবে যে অর্থ সঠিকভাবে স্থানান্তর হয়েছে। পাশাপাশি সব সময় ব্যাংকের অফিসিয়াল অ্যাপ ব্যবহার এবং নিয়মিত অ্যাপ আপডেট রাখারও পরামর্শ দেন তিনি।
রিয়াজুল ইসলামের মতে, বাংলা কিউআর বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি শুধু পেমেন্টকে সহজ করবে না; বরং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াবে, ক্ষুদ্র ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করবে এবং ব্যাংকগুলোর জন্যও নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। তবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে প্রযুক্তির বিস্তৃত ব্যবহার, সব অংশীজনের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সর্বোপরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বাংলা কিউআরের নিয়মিত ব্যবহারের ওপর। আর সে কারণেই এবি ব্যাংকের লক্ষ্য কেবল কিউআর বিতরণ নয়, বরং বাংলা কিউআরের নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করা।