ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তারেও কমছে না নগদ টাকার চাহিদা
দেশের আর্থিক খাতে গত এক দশকে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি এসেছে লেনদেন ব্যবস্থায়। এখন মোবাইল ফোনেই টাকা পাঠানো যায়, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল পরিশোধ করা যায়, বাজার-সদাই থেকে শুরু করে কর ও ফি জমাও দেওয়া যায় কয়েক মিনিটে। ব্যাংকের শাখায় না গিয়েও অ্যাপের মাধ্যমে কোটি টাকার লেনদেন করছেন অনেক গ্রাহক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে ডিজিটাল পেমেন্টভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য সামনে রেখে ধারাবাহিকভাবে নতুন নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
কিন্তু এই পরিবর্তনের মাঝেও একটি পরিসংখ্যান অর্থনীতিবিদদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত বাড়লেও মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ কমছে না, বরং অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—প্রযুক্তির বিস্তার কি সত্যিই নগদের বিকল্প হতে পারছে, নাকি ডিজিটাল ও নগদ—দুটি ব্যবস্থাই পাশাপাশি বড় হচ্ছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। মাত্র এক বছর আগে এ পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বেড়েছে প্রায় ৫২ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা, যা প্রবৃদ্ধির হিসাবে প্রায় ১৮ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, জুন ও জুলাই মাসে এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। জুলাই শেষে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, এটি সাময়িক কোনো ঘটনা নয়। ২০১১ সালে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ ছিল মাত্র ৫৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। এক দশকের কিছু বেশি সময়ে সেই পরিমাণ প্রায় সাড়ে ছয় গুণ বেড়েছে। ২০২১ সালের জুনে এটি প্রথমবার ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়ায়। ২০২২ সালে দাঁড়ায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা এবং ২০২৩ সালে বেড়ে হয় ২ লাখ ৯১ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ধীর হলেও ২০২৬ সালে আবারও অস্বাভাবিক উল্লম্ফন দেখা যায়।
একই সময়ে দেশের ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনও থেমে নেই। মোবাইল আর্থিক সেবায় প্রতি মাসে আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ মিলিয়েও মাসে প্রায় একই পরিমাণ অর্থ স্থানান্তর হচ্ছে। ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ‘বাংলা কিউআর’ চালুর মাধ্যমে ছোট দোকানেও ডিজিটাল পেমেন্ট পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ অবকাঠামোগত দিক থেকে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, ডিজিটাল লেনদেন বাড়লেও নগদ অর্থ কেন আরও দ্রুত বাড়ছে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, এর পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং মূল্যস্ফীতি, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তার, ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট, নগদনির্ভর ব্যবসায়িক সংস্কৃতি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে একই পরিমাণ পণ্য কিনতে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। গত তিন বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। ফলে বাজারে স্বাভাবিকভাবেই বেশি নগদ অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। তবে শুধু মূল্যস্ফীতিকে দিয়ে পুরো চিত্র ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ একই সময়ে নগদ অর্থের প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির হারকে ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ব্যাংক খাতে নতুন আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫২২ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ বৃদ্ধি ছিল ৮৯ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ আমানতও বাড়ছে, আবার ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থও বাড়ছে। সাধারণ অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, এই দুই প্রবণতা একই সঙ্গে এত দ্রুত বাড়া অস্বাভাবিক। ফলে অর্থনীতির ভেতরে অর্থের প্রবাহ ও ব্যবহার নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এর একটি বড় কারণ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তার। দেশের বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসা, পাইকারি বাজার, কৃষিপণ্য বেচাকেনা এবং স্থানীয় বাণিজ্যের বড় অংশ এখনো নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল পদ্ধতি থাকলেও ব্যবসায়ীরা কর-সংক্রান্ত জটিলতা, লেনদেন ব্যয় কিংবা অভ্যাসগত কারণে নগদ অর্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকিং খাতের আস্থার প্রশ্ন। গত কয়েক বছরে কয়েকটি ব্যাংককে ঘিরে অনিয়ম, তারল্য সংকট ও পরিচালনাগত দুর্বলতার ঘটনা বহু আমানতকারীকে উদ্বিগ্ন করেছে। বিশেষ করে চলতি বছরের মাঝামাঝি একটি বড় বেসরকারি ব্যাংককে ঘিরে অস্থিরতার সময় বহু গ্রাহক নগদ অর্থ তুলে নেন। এর প্রভাব শুধু ওই ব্যাংকে সীমাবদ্ধ ছিল না; অন্য কয়েকটি ব্যাংক থেকেও সতর্কতামূলকভাবে অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এতে বাজারে নগদ অর্থের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।
ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বেড়ে যাওয়ার অর্থ শুধু মানুষের হাতে বেশি টাকা থাকা নয়। এর অর্থ হচ্ছে, সেই অর্থ ব্যাংকের আমানত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। ফলে সেই অর্থ থেকে নতুন ঋণ সৃষ্টি, শিল্পে বিনিয়োগ কিংবা উৎপাদনমুখী খাতে অর্থায়নের সুযোগও কমে যায়। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে আর্থিক মধ্যস্থতার সক্ষমতা কমে যাওয়া হিসেবে দেখা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ দীর্ঘ সময় ধরে থাকলে তার আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো অপ্রদর্শিত অর্থনীতির বিস্তার। নগদ লেনদেনের মাধ্যমে পরিচালিত ব্যবসার একটি অংশ কর প্রশাসনের নজরের বাইরে থেকে যেতে পারে। এতে রাজস্ব আহরণ ব্যাহত হয়, আর্থিক স্বচ্ছতা কমে এবং অর্থপাচার কিংবা কর ফাঁকির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ এমন একটি সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন একদিকে ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার ঘটছে, অন্যদিকে নগদ অর্থের চাহিদাও বাড়ছে। এই দুই বিপরীতমুখী প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি অর্থনীতির ভেতরে এখনো কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। শুধু নতুন প্রযুক্তি চালু করলেই নগদের ব্যবহার কমে যাবে—বাস্তবতা আপাতত সেই বার্তা দিচ্ছে না। বরং আর্থিক খাতে আস্থা, সুশাসন, কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ—সবগুলো ক্ষেত্রেই একযোগে অগ্রগতি না হলে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পাহাড় আরও বড় হতে পারে।