হরমুজ খোলার আশায় তিন সপ্তাহের সর্বনিম্নে তেলের দাম, সতর্কবার্তা ট্রাম্পের
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম তিন সপ্তাহের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে শিগগিরই জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে পারে—এমন প্রত্যাশায় সরবরাহ-সংকটের আশঙ্কা কমে আসায় দামে এ পতন ঘটেছে। তবে একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি ‘খুব শিগগিরই’ খুলে দেওয়া হবে, অন্যথায় ইরানকে ‘খুব কঠোরভাবে আঘাত’ করা হবে। খবর বিবিসির।
গত সোমবার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের নিচে নেমে আসে। মঙ্গলবার এশিয়ার লেনদেনেও দাম আরও প্রায় ০.৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও ৫ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৬ ডলারে দাঁড়ায়। উভয় বেঞ্চমার্কের দামই ১৩ জুলাইয়ের পর সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। তার দাবি, দীর্ঘ কয়েক মাসের সংঘাতের অবসান ঘটাতে ইরানও সমঝোতার পথে এগোতে আগ্রহী।
এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও জানান, চলমান আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে এবং সপ্তাহের শেষ দিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আবার শুরু হতে পারে বলে তারা আশাবাদী।
রুবিও বলেন, হরমুজ দিয়ে আরও বেশি জাহাজ চলাচলের বিষয়ে ইরান ও ওমানের সঙ্গে আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
অন্যদিকে স্কট বেসেন্ট জানান, মঙ্গলবার বা বুধবারের মধ্যেই প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হতে পারে। জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান কোনো ফি আদায় করতে পারবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি হবে অবাধ নৌ চলাচলের ব্যবস্থা।
তবে মার্কিন কর্মকর্তারা আলোচনার অগ্রগতির কথা জানালেও সম্ভাব্য চুক্তির শর্ত বা কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেননি।
এদিকে ইরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো সরাসরি আলোচনা চলছে না এবং এমন কোনো পরিকল্পনাও নেই। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, মধ্যস্থতাকারী ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নতুন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা ইতিবাচক হয়েছে। একই সঙ্গে কাতারও জানিয়েছে, তারা অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কমান্ড সেন্টকম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্তর্জাতিক জলসীমা দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য পথ উন্মুক্ত ও নিরাপদ রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংঘাত নিরসনের একাধিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা পুরোপুরি কাটেনি। তেলের দামের ওঠানামার প্রভাব ইতোমধ্যে ভোক্তাদের ওপরও পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গাড়িচালক ও ব্যবসায়ীদের খরচও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এদিকে বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজকে দুটি সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘায়িত সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্র তাদের দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশ্বিক মজুদের প্রায় পুরোটাই ব্যবহার করে ফেলেছে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরুর আগে এ জলপথ দিয়ে বিশ্বের দৈনিক অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। সংঘাত শুরু হওয়ার পর ইরান অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে।
অন্যদিকে ২০ জুলাই থেকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বন্দরগুলোর ওপরও অবরোধ আরোপ করেছে। ফলে বিকল্প নৌপথ হিসেবেও ঝুঁকি বেড়েছে। সম্প্রতি ইয়েমেন উপকূলের কাছে একটি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ডুবে যায়। ভারতের নৌপরিবহনমন্ত্রী জানিয়েছেন, জাহাজে থাকা ১৪ আরোহীকেই জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে তেলবাহী জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এখন সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে স্বস্তি ফিরতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর চাপ আরও কমতে পারে।