বিশেষ প্রতিনিধি: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্বাভাবিক উল্লম্ফনের কারণে বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন—এই চার মাসে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রয়ে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এই অর্থ পূরণে সরকারের কাছে সমপরিমাণ ভর্তুকি চেয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় থেকে গত ২৮ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বিপিসিকে এই ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে দেশের বাজারে একই হারে দাম সমন্বয় না হওয়ায় বিপিসিকে লোকসান দিয়ে তেল বিক্রি করতে হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশে জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, বিপণন ও বিতরণের প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান বিপিসি। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, জাহাজভাড়া, বীমা এবং অন্যান্য আমদানি ব্যয়ের বিপরীতে দেশের বাজারে বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যের ওপর সংস্থাটির লাভ-লোকসান অনেকটাই নির্ভরশীল।
![]()
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, মার্চে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ২ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। এপ্রিলে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকায়। মে মাসে লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৬২১ কোটি টাকা এবং জুনে ৫ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ চার মাসে মোট লোকসানের পরিমাণ ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বড় ভূমিকা রেখেছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত তীব্র হওয়ার পর অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা বাড়ে। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হওয়ায় জাহাজভাড়া, পরিবহন ব্যয় ও যুদ্ধঝুঁকির বীমা ব্যয়ও বেড়ে যায়।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতে। বিপিসির হিসাবে, সংঘাতের আগে প্রতি ব্যারেল ডিজেল আমদানির গড় দাম ছিল প্রায় ৮৬ মার্কিন ডলার। জুনে সেই দাম বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছে। একই সময়ে অকটেনের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৩ ডলার থেকে বেড়ে ১০৪ ডলারে ওঠে।
তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে এই উত্থানের বিপরীতে দেশের বাজারে দাম পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি। ফলে আমদানি ব্যয়ের তুলনায় কম দামে জ্বালানি তেল বিক্রি করতে হয়েছে বিপিসিকে। এতে সংস্থাটির ওপর দ্রুত আর্থিক চাপ বাড়তে থাকে।
এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার সময়ও বিপিসি সরকারের কাছে ভর্তুকি চেয়েছিল। সংস্থাটির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও তা আমদানিতে ব্যয় হচ্ছিল ২০৩ টাকা ৮৪ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি লিটারে লোকসান ছিল ১০৩ টাকা ৮৪ পয়সা।
অকটেনের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ছিল একই রকম। প্রতি লিটার অকটেন ১২০ টাকা দরে বিক্রি করা হলেও আমদানিতে ব্যয় হচ্ছিল ১৫১ টাকা ৬১ পয়সা। এতে প্রতি লিটারে লোকসান দাঁড়ায় ৩১ টাকা ৬১ পয়সা। ওই পরিস্থিতিতে দাম সমন্বয় না করা হলে বিপিসির সম্ভাব্য লোকসান ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল সংস্থাটি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ এপ্রিল দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকায় দাম বাড়ানোর পরও বিপিসির লোকসান বন্ধ হয়নি। শেষ পর্যন্ত মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার মাসের লোকসানের হিসাব করে সরকারকে ভর্তুকির জন্য নতুন করে আবেদন করতে হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক লোকসানের চিত্রের সঙ্গে বিপিসির গত কয়েক বছরের আর্থিক অবস্থার বড় পার্থক্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি তেল আমদানি এবং দেশের বাজারে বিক্রয়ের কারণে গত কয়েক বছরে সংস্থাটি উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে জ্বালানি তেল বিক্রি করে বিপিসি নিট মুনাফা করেছে ৪ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪ সালে নিট মুনাফা হয়েছিল ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ২৭৩ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি মোট ৬২ লাখ ১৫ হাজার ৯২৯ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। এতে মোট ব্যয় হয় ৫০ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫ লাখ ১০ হাজার ৯৪৪ টন অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ৪৭ লাখ ৪ হাজার ৯৮৫ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৩৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও কেরোসিন আমদানিতে খরচ হয়েছে ৩৬ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। ফার্নেস অয়েল ও মেরিন ফুয়েল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে আরও ৩ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা।
বিপিসির আর্থিক সক্ষমতার আরেকটি দিক হলো সরকারের রাজস্বে সংস্থাটির বড় অবদান। বিপিসির অর্থ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর যুদ্ধের আগ পর্যন্ত বিপিসি সরকারকে কর ও ভ্যাট বাবদ প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। একই সময়ে সরকারের একটি তহবিলেও প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, বিপিসির মুনাফার বড় একটি অংশ ভবিষ্যৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং দেশের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। ভর্তুকির বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হলেও এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা করছেন বিপিসির এই কর্মকর্তা।
দেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে দেশের বাজারের সমন্বয়ের বিষয়টি আলোচনায় ছিল। ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের মধ্যে দেশে একবারে প্রায় ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও তা সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের ভোক্তারাও তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিপরীতে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হলে দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়ার কথা।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে আকস্মিক ও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হলে শুধু মূল্য সমন্বয় করলেই বিপিসির আর্থিক চাপ পুরোপুরি সামাল দেওয়া কঠিন। বিশেষ করে যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে তেলের মূল্যের পাশাপাশি পরিবহন, জাহাজভাড়া ও বীমা ব্যয় একসঙ্গে বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়ে।
এ কারণে বিপিসির ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকার ভর্তুকির আবেদনকে শুধু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের লোকসান পূরণের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, সরকারি ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আয় এবং সাধারণ মানুষের ওপর জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব সরাসরি যুক্ত।
আন্তর্জাতিক বাজারে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ব্যয় আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে বিপিসির ভর্তুকির প্রয়োজনও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারের পুরো মূল্যবৃদ্ধি দেশের বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানান্তর করা হলে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে কৃষি, শিল্প ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে তার প্রভাব পড়তে পারে।
ফলে সামনে সরকারের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে দুটি বিষয় একসঙ্গে সামলানো—একদিকে বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখা, অন্যদিকে ভোক্তার ওপর জ্বালানি মূল্যের অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে জ্বালানি মূল্য নির্ধারণের বর্তমান কাঠামো, ভর্তুকি নীতি এবং বিপিসির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন হতে পারে।