বঙ্গোপসাগরের বুকে মেঘনা মোহনায় জেগে ওঠা নিঝুম দ্বীপের সৈকতের বালিতে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান ভারী খনিজের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। সাম্প্রতিক খনিজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই দ্বীপের সৈকতের মোট পলির প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশই হলো টোটাল হেভি মিনারেলস বা টিএইচএম। এর মধ্যে রয়েছে শিল্প ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জিরকন, রুটাইল, ইলমেনাইট, গার্নেট, সিলিম্যানাইট, কায়ানাইট, মোনাজাইট ও জেনোটাইমের মতো মূল্যবান খনিজ। গবেষকদের মতে, নিঝুম দ্বীপের বালিতে এই ভারী খনিজগুলোর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি বাংলাদেশের খনিজসম্পদ অনুসন্ধান ও শিল্পোৎপাদনে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করতে পারে। বিশেষ করে সিরামিক, রং, ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ওয়েল্ডিং রডের মতো বিভিন্ন শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে এসব খনিজের ব্যাপক অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
নিঝুম দ্বীপে পাওয়া এই খনিজসমৃদ্ধ বালির পেছনের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হিমালয় থেকে বিপুল পরিমাণ পলি বহন করে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদ বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং মেঘনা মোহনা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। দীর্ঘ নদীপথ, মোহনা, বদ্বীপ ও সমুদ্রতলের বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসব পলি পরিবাহিত ও পুনর্বিন্যস্ত হয়। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উপকূলীয় অঞ্চলে পলি জমা হয়ে ভারী খনিজসমৃদ্ধ বালুর স্তর তৈরি হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বঙ্গীয় শেলফের পলি ও গভীর সমুদ্রের পলিতে ব্রহ্মপুত্রের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি এবং বালুর ক্ষেত্রে এর অবদান অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ হতে পারে। জোয়ার-ভাটা, ঢেউ ও সমুদ্রস্রোতের প্রভাবে তুলনামূলক ঘন খনিজ কণাগুলো নির্দিষ্ট পরিবেশে জমা হওয়ার সুযোগ পায়।
নমুনার উন্নত এক্স-রে ডিফ্রেকশন বা এক্সআরডি প্রযুক্তির মাধ্যমে গবেষকরা এই খনিজগুলোর সুনির্দিষ্ট উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন। জাপানের তৈরি স্মার্টল্যাব এসই রিগাকু এক্স-রে ডিফ্রেক্টোমিটার ব্যবহার করে বালুর নমুনা বিশ্লেষণ করা হয় এবং এক্সপার্ট হাইস্কোর প্লাস সফটওয়্যারের অটো-ম্যাচিং পদ্ধতির মাধ্যমে খনিজগুলো নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিঝুম দ্বীপের বালিতে সিলিম্যানাইট, গার্নেট বা অ্যালমান্ডিন, জিরকন, রুটাইল, ইলমেনাইট, জেনোটাইম, মোনাজাইট ও কায়ানাইট ছাড়াও অ্যামফিবোল এবং পাইরক্সিন গ্রুপের বিভিন্ন খনিজ রয়েছে। এছাড়া বালুর চৌম্বকীয় অংশে এনস্টাটাইট, বায়োটাইট, পারগাসাইট, মাসকোভাইট, সোডালাইট, ডায়োপসাইড ও ম্যাগনেসাইটের মতো নানা খনিজের উপস্থিতি চিহ্নিত হয়েছে।
এই খনিজগুলোর মধ্যে জিরকন, রুটাইল ও ইলমেনাইট আন্তর্জাতিক শিল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রুটাইল ও ইলমেনাইট টাইটানিয়ামসমৃদ্ধ হওয়ায় এগুলো থেকে টাইটানিয়াম-ভিত্তিক শিল্পের কাঁচামাল পাওয়া যায়। অন্যদিকে সিলিম্যানাইট ও কায়ানাইট উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করার ক্ষমতা রাখায় অবাধ্য বা রিফ্র্যাক্টরি শিল্পে ব্যবহারযোগ্য। গার্নেট ঘর্ষণকারী উপাদান হিসেবে এবং মোনাজাইট ও জেনোটাইমের মতো খনিজ বিরল মৃত্তিকা উপাদানসহ বিভিন্ন মূল্যবান উপাদানের উৎস হিসেবে কাজ করে।
তবে নিঝুম দ্বীপের বালিতে ২৫ শতাংশ ভারী খনিজ পাওয়া গেলেও এটিকে সরাসরি বাণিজ্যিক খনিজ মজুদ হিসেবে ঘোষণা করার কোনো সুযোগ নেই। বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের আগে এর প্রকৃত পরিমাণ, বিস্তৃতি, গভীরতা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় এবং পরিবেশগত প্রভাব নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। নিঝুম দ্বীপ একটি সংবেদনশীল উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় খনিজ উত্তোলনের ক্ষেত্রে এর সৈকত ও জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তা সত্ত্বেও প্রাথমিক এই গবেষণা বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে দেশীয় শিল্পের কাঁচামাল আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি নির্বাচিত খনিজ প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানির সুযোগও তৈরি হতে পারে।