দেশের চলমান গ্যাস সংকট স্থায়ীভাবে কাটিয়ে জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, তাৎক্ষণিকভাবে সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
শনিবার দুপুরে সিলেটে একটি কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাণিজ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশের জ্বালানি সংকটের বিষয়টি এখন আর আড়াল করার সুযোগ নেই। গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে প্রভাব ফেলছে। এ পরিস্থিতি থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। আর সেই অবকাঠামো রাতারাতি নির্মাণ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের ঘাটতি দূর করতে সরকার বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রচলিত চিন্তাধারার বাইরে গিয়ে সংকট মোকাবিলায় নতুন নতুন পথ খোঁজা হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন। অবকাঠামো নির্মাণ, সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে প্রায় দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর ভাষ্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ব্যবস্থা করতে হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। শুধু আমদানি বাড়িয়ে বা সাময়িকভাবে সরবরাহ বাড়িয়ে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য গ্যাস গ্রহণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণের অবকাঠামো শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, আপৎকালীন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সরকার তাৎক্ষণিক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত যাতে প্রয়োজনীয় গ্যাস পায়, সে জন্য সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
দেশের অর্থনীতিতে গ্যাসের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, শিল্পকারখানার উৎপাদন সচল রাখা, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ প্রয়োজন। গ্যাসের সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়ে। তাই জ্বালানি খাতকে শক্তিশালী করার বিষয়টি সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।
এদিকে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মালয়েশিয়া থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির চেষ্টা চলছে বলেও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। আমদানির ব্যবস্থা থাকলেও তা গ্রহণ ও সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন।
মালয়েশিয়া থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির উদ্যোগের বিষয়ে তিনি জানান, দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনায় বিভিন্ন উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে সরবরাহের চাপ কিছুটা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটের মধ্যে শিল্পোদ্যোক্তারা নিয়মিতভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী শিল্পে গ্যাসের চাপ কমে গেলে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা কমে যায়। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও গ্যাসের সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে গ্যাসের ঘাটতি শুধু একটি জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়, এর সঙ্গে শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়ও জড়িত।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী মনে করেন, এই দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সময় দিতে হবে। অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় সক্ষমতা বাড়বে এবং বর্তমান সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতের বাড়তি চাহিদাও সামাল দেওয়া সহজ হবে।
তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট কাটাতে শুধু বর্তমান সমস্যার দিকে তাকালে হবে না। ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি ও শিল্পের আকার কতটা বাড়বে, সেই হিসাব করেই অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। সেই লক্ষ্যেই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, গ্যাস সংকট থেকে দ্রুত মুক্তির পাশাপাশি স্থায়ী সমাধানের জন্য অবকাঠামো উন্নয়নকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে সে সক্ষমতা তৈরি হতে সময় লাগবে। এ সময়ের মধ্যে আমদানি ও অন্যান্য জরুরি ব্যবস্থার মাধ্যমে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালানো হবে।