নিজস্ব প্রতিবেদক
সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। ফলে সাধারণত কর্মদিবসের তুলনায় এদিন বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকার কথা। অতীতে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়ও এমন চিত্রই দেখা গেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। ছুটির দিনেও বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে না। কোনো কোনো সময়ে তা ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ও সরবরাহ কম থাকায় একই সময়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিংও করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) গতকালের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রাক্কলন অনুযায়ী, দিনের বেলায় সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছিল ১৪ হাজার ১৭৬ মেগাওয়াট। রাতে সর্বোচ্চ চাহিদার প্রাক্কলন ছিল ১৬ হাজার ৯০ মেগাওয়াট। তবে বাস্তবে বিদ্যুতের চাহিদা এই প্রাক্কলনকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিপিডিবির ঘণ্টাভিত্তিক বিদ্যুৎ চাহিদা ও সরবরাহের হিসাব অনুযায়ী, ২৮ আগস্ট রাত ১টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১৭১ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময়ে লোডশেডিং করতে হয়েছে ৩ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট। গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত এটিই ছিল সর্বোচ্চ লোডশেডিং।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত দুই হাজার মেগাওয়াটের ব্যবধান ছিল। অর্থাৎ এ সময়জুড়ে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে। সকাল ৯টার পর বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমতে শুরু করলে লোডশেডিংও কমে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াটে নেমে আসে।
দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতি থাকায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ দিতে পারছে না বিপিডিবি। ফলে বিতরণ এলাকাগুলোর চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। মফস্বলের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও দিন ও রাতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ অফিস বন্ধ থাকায় সাধারণত কর্মদিবসের তুলনায় বিদ্যুতের চাহিদা দেড় থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট কম থাকার কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, ছুটির দিনেও চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে না। বরং কোনো কোনো সময়ে তা কর্মদিবসের চাহিদাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
এদিকে বিপিডিবি যে পরিমাণ বিদ্যুতের চাহিদা প্রাক্কলন করছে, বাস্তব চাহিদা দাঁড়াচ্ছে তার চেয়েও বেশি। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও বিদ্যুতের চাহিদা এত বেশি থাকার কারণ সম্পর্কে অবশ্য বিপিডিবির পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
তবে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের কারণে দেশের অনেক শিল্প-কারখানা সপ্তাহের বেশির ভাগ সময় নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ করতে পারেনি। ফলে উৎপাদনের ঘাটতি পুষিয়ে নিতে অনেক কারখানা সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখছে বলে ধারণা করছেন বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দেশের অনেক শিল্প-কারখানা সাধারণত জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের পরিবর্তে নিজস্ব ক্যাপটিভ জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। কিন্তু প্রায় এক মাস ধরে চলমান গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানাই প্রয়োজনীয় মাত্রায় ক্যাপটিভ জেনারেটর চালাতে পারছে না। ফলে উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে তাদের জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
শিল্প-কারখানায় গ্রিডনির্ভরতা বাড়ার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সার্বিক বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে সপ্তাহের অন্যান্য দিনে গ্যাস সংকটের কারণে ব্যাহত হওয়া উৎপাদন ছুটির দিনে চালিয়ে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হওয়ায় শুক্রবারেও শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে।
এর ফলে একদিকে গ্যাস সংকটে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো গ্রিডের ওপর বেশি নির্ভর করছে। বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সরবরাহ ঘাটতির সঙ্গে এই বাড়তি চাহিদা যুক্ত হওয়ায় ছুটির দিনেও লোডশেডিং কমছে না। বরং কোনো কোনো সময়ে তা কর্মদিবসের মাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।![]()