বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সোনা শুধু মূল্যবান ধাতু নয়, এটি রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তার অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। যুদ্ধ, আর্থিক সংকট, নিষেধাজ্ঞা কিংবা মুদ্রাবাজারে অস্থিরতার সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সম্পদ হয়ে ওঠে স্বর্ণের মজুত। সেই কারণেই কয়েক দশক ধরে বিশ্বের বহু দেশ নিজেদের সোনার একটি বড় অংশ বিদেশের নিরাপদ ভল্টে সংরক্ষণ করে এসেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে এই সংরক্ষণের প্রধান কেন্দ্র।
তবে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশ ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রে রাখা সোনা সরিয়ে নিজ দেশে বা ইউরোপের অন্য ভল্টে স্থানান্তর করছে। সর্বশেষ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে নেদারল্যান্ডস। দেশটির পদক্ষেপ নতুন করে আলোচনায় এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কেন ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে রাখা সোনার অবস্থান বদলাচ্ছে?
নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডি নেদারল্যান্ডশে ব্যাংক (ডিএনবি) জানিয়েছে, নিউইয়র্ক ও কানাডার অটোয়ায় সংরক্ষিত ৮৬ টন সোনা লন্ডনে নেওয়া হবে। ব্যাংকটির ভাষ্য, এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ। একাধিক অঞ্চলে সোনা ভাগ করে রাখলে কোনো একটি এলাকায় সংকট তৈরি হলেও পুরো মজুত ঝুঁকির মুখে পড়ে না। একই সঙ্গে প্রয়োজনের সময় দ্রুত লেনদেন করাও সহজ হয়।
এই সিদ্ধান্তের ফলে নেদারল্যান্ডসের সোনা সংরক্ষণের ভারসাম্যও বদলে যাচ্ছে। আগে দেশটির মোট মজুতের ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল নিউইয়র্কে এবং ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল অটোয়ায়। স্থানান্তরের পর দুই স্থানেই থাকবে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ করে। অন্যদিকে লন্ডনে থাকা অংশ বেড়ে দাঁড়াবে ৩২ দশমিক ১ শতাংশে। প্রায় ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ সোনা থাকবে নেদারল্যান্ডসের নিজস্ব ভল্টে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, সোনা যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরানোই হয়, তাহলে লন্ডনে নেওয়া হচ্ছে কেন?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাইকারি সোনা লেনদেনের কেন্দ্র হলো লন্ডন। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে রাখা সোনা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রত্যয়ন করা থাকে। ফলে প্রয়োজন হলে খুব দ্রুত তা বিক্রি, বন্ধক বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে লেনদেন করা যায়। ডিএনবির মতে, সংকটের সময়ে সবচেয়ে কার্যকর সম্পদ হলো এমন সোনা, যা মুহূর্তেই বৈশ্বিক বাজারে ব্যবহার করা সম্ভব।
অথচ একসময় নিউইয়র্কই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ স্বর্ণভান্ডার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও আর্থিক শক্তির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। শীতল যুদ্ধের সময় ইউরোপের অনেক দেশ আশঙ্কা করেছিল, মহাদেশে সংঘাত শুরু হলে তাদের সম্পদ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই তারা সোনার বড় অংশ আটলান্টিকের ওপারে নিউইয়র্কে সংরক্ষণ করে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্যও নিউইয়র্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
আজও সেই ঐতিহ্য পুরোপুরি ভাঙেনি। বিশ্বের বহু দেশের হাজার হাজার টন সোনা এখনো নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভের ভূগর্ভস্থ ভল্টে সংরক্ষিত রয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের আগে একই ধরনের পদক্ষেপ নেয় ফ্রান্স। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জানুয়ারির মধ্যে নিউইয়র্কে রাখা ১২৯ টন সোনা বিক্রি করে দেয়। পরে সেই অর্থ দিয়ে ইউরোপে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সমপরিমাণ নতুন সোনা কেনা হয়। বর্তমানে সেই সোনা প্যারিসে সংরক্ষিত রয়েছে। ফ্রান্সের মোট সোনার মজুত প্রায় ২ হাজার ৪৩৭ টন। মোট মজুতের তুলনায় এই অংশ ছোট হলেও সংরক্ষণ কৌশলে এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
জার্মানি আরও আগে এই পথ ধরেছিল। ২০১৭ সালে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুন্দেসব্যাংক নিউইয়র্ক থেকে ৩০০ টন সোনা ফ্রাঙ্কফুর্টে ফিরিয়ে আনে। একই সময়ে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখা ৩৭৪ টন সোনার পুরো মজুতও দেশে স্থানান্তর করা হয়। লক্ষ্য ছিল, দেশের অধিকাংশ সোনা নিজস্ব ভল্টে রাখা। তবু জার্মানি পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়েনি। এখনো তাদের মোট সোনার ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ নিউইয়র্কে রয়েছে।
গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতি, বাণিজ্যিক উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে ইউরোপে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। বিভিন্ন মহলে বিদেশে থাকা সোনা দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি উঠলেও জার্মানি ও ইতালি সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি। এই দুই দেশের প্রায় ২৪৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সোনা এখনো নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের ভল্টে সংরক্ষিত।
জার্মানি ও ইতালি বিশ্বের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃহত্তম সোনার মজুতধারী দেশ। জার্মানির মজুত ৩ হাজার ৩৫২ টন, ইতালির ২ হাজার ৪৫২ টন। ইতালির মোট সোনার ৪৩ শতাংশেরও বেশি এখনো যুক্তরাষ্ট্রে রাখা আছে। বিশ্লেষকদের মতে, নিউইয়র্ক বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার একটি কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোনা রাখা এখনো কৌশলগতভাবে লাভজনক।
সবচেয়ে বেশি সরকারি সোনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। দেশটির মোট মজুত ৮ হাজার ১৩৩ টন। এরপর রয়েছে জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্স। এই চার দেশই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণসম্পদের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ সারিতে।
শুধু ইউরোপ নয়, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশও নিউইয়র্কে সোনা সংরক্ষণ করে। জার্মানির মোট মজুতের ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ সেখানে রয়েছে। ইতালির ৪৩ শতাংশের বেশি সোনা যুক্তরাষ্ট্রে রাখা। লেবাননের আনুমানিক ৪০ শতাংশ সোনা নিউইয়র্কে সংরক্ষিত বলে আন্তর্জাতিক সূত্র জানিয়েছে। ভারতের সোনার একটি অংশও বিদেশি ভল্টের মধ্যে নিউইয়র্কে রয়েছে। তবে অনেক দেশ নিরাপত্তার কারণে তাদের সোনার অবস্থান প্রকাশ করে না।
বিদেশে রাখা সোনা দেশে ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ভেনেজুয়েলা। প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ব্যাংকে রাখা প্রায় ১৬০ টন সোনা দেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন। তার মতে, এটি ছিল জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীক। ২০১২ সালের মধ্যে সেই স্থানান্তর সম্পন্ন হয়।
তবে সব সোনা ফেরত আসেনি। ভেনেজুয়েলার প্রায় ৩১ টন সোনা এখনো ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে আটকে রয়েছে। রাজনৈতিক স্বীকৃতি–সংক্রান্ত বিরোধের কারণে দেশটি সেই সোনা ফেরত পায়নি। এই ঘটনাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে দেখা হয়—বিদেশে রাখা সম্পদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার পাশাপাশি আইনি ও কূটনৈতিক ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হয়।
তাহলে কি ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারাচ্ছে?
বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি আস্থাহীনতার চেয়ে কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। এখন অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক দেশে সব সোনা রাখার পরিবর্তে ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের নীতি অনুসরণ করছে। কিছু মজুত নিজ দেশে, কিছু লন্ডনে এবং কিছু নিউইয়র্কে রেখে তারা ঝুঁকি ভাগ করে দিচ্ছে।
অর্থাৎ, লক্ষ্য একটাই—যে পরিস্থিতিই তৈরি হোক না কেন, রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ যেন নিরাপদ থাকে এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে দ্রুত ব্যবহার করা যায়। নেদারল্যান্ডসের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সেই দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক প্রবণতারই আরেকটি স্পষ্ট উদাহরণ।![]()