মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইউরোপের গ্যাসের বাজারে। উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে এলএনজির দাম বেড়ে ২০২৩ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি উঠেছে। সামনে শীত মৌসুমে গ্যাসের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা থাকায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগও তীব্র হচ্ছে।
আরগাস মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শেষ দিকে উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট এলএনজির দাম দাঁড়ায় ২২ ডলার ৮৩ সেন্ট। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় এ দাম দ্বিগুণেরও বেশি। একই সঙ্গে এটি ২০২৩ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি।
এলএনজির বাজারে চাপ বাড়ার অন্যতম কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন। ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথে এলএনজি পরিবহন কমে গেছে। বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে হরমুজ দিয়ে সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব দ্রুতই আন্তর্জাতিক বাজারে পড়ছে।
গ্যাসের বাজারে এ ধরনের সংকটের প্রভাব জ্বালানি তেলের তুলনায় বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ পরিবহন ব্যবস্থা। অপরিশোধিত তেল তুলনামূলক সহজে বিভিন্ন সমুদ্রপথে পরিবহন করা যায়। এলএনজি পরিবহনের জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত ও ব্যয়বহুল জাহাজ। ফলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র আটটি এলএনজিবাহী জাহাজ বের হয়েছে। যুদ্ধের আগে এ পথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিনটি এলএনজিবাহী জাহাজ চলাচল করত। জাহাজ চলাচলে এই বড় পতন সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে ইরানের পারস্য উপসাগরীয় কর্তৃপক্ষের হুমকি। তারা কয়েক ডজন জাহাজকে জরিমানা কিংবা জব্দ করার হুমকি দিয়েছে। কালো তালিকায় থাকা ৪৬টি জাহাজের মধ্যে ১০টি এলএনজিবাহী জাহাজও রয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর জন্য ঝুঁকি বেড়েছে।
ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন গ্যাসের মজুদ। সংঘাত শুরুর আগেই ইউরোপের গ্যাস মজুদ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কম ছিল। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে এরই মধ্যে জরুরি মজুদ থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। এতে শীত মৌসুম শুরুর আগে মজুদ পুনর্গঠনের কাজ আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।
গ্যাস ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইউরোপের তথ্য বলছে, আগস্টে ইউরোপে প্রতিদিন গড়ে ৩ টেরাওয়াট ঘণ্টা গ্যাস মজুদ করা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে দৈনিক মজুদের হার ছিল ৩ দশমিক ৬ টেরাওয়াট ঘণ্টা। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার গ্যাস মজুদের গতি কমেছে। খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, শীতের আগে পর্যাপ্ত মজুদ তৈরি করতে না পারলে ইউরোপের গ্যাসের বাজার আরো অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
ইউরোপকে একই সঙ্গে এশিয়ার ক্রেতাদের সঙ্গে এলএনজি সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে। আগস্টে এশিয়ার প্রধান এলএনজি মূল্যসূচক ১৩ শতাংশ বেড়েছে। ২৫ আগস্ট সেখানে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট এলএনজির দাম ছিল ২৪ ডলার ৮ সেন্ট। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চাহিদার চাপ বাড়লে সরবরাহকারীদের জন্য এশিয়ার বাজারও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
এতে ইউরোপের আমদানিকারকদের জন্য এলএনজি সংগ্রহের ব্যয় আরো বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইউরোপের গ্যাস মজুদ দ্রুত বাড়ানো না গেলে শীতের সময় চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত আমদানির প্রয়োজন হতে পারে। তখন উচ্চমূল্যের এলএনজি কিনতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতের ব্যয়ও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহন স্বাভাবিক না হলে এবং ইউরোপের গ্যাস মজুদ দ্রুত বাড়ানো না গেলে শীতের আগে দাম আরো বাড়তে পারে। ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতাদের মধ্যে এলএনজি নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র হলে এর প্রভাব শুধু আঞ্চলিক বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক গ্যাসের বাজারেও মূল্যচাপ তৈরি হতে পারে।![]()