দেশে গ্যাস সরবরাহের বর্তমান সংকট আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই কেটে যাবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সোমবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ‘এনার্জি সিকিউরিটি ইন বাংলাদেশ: ফ্রম ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট টু এ রেজিলিয়েন্ট এনার্জি ট্রানজিশন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সেমিনারে বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর রহমান, এসটেক্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মনজুর আলম প্রধানসহ জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অধ্যাপক তিতুমীর বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। খাতটি আর্থিক সংকটে ছিল এবং একই সঙ্গে কৌশলগত দিকনির্দেশনারও ঘাটতি ছিল।
তিনি বলেন, ‘আজকের যে পরিস্থিতি, তাতে পূর্বতন নীতিমালার মাধ্যমে আমাদের একটি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ফাঁদে ফেলা হয়েছে।’
তার অভিযোগ, বিগত সরকার কৌশলগতভাবে দেশের জ্বালানি খাতকে অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভর করে তুলেছিল। এর ফলে বর্তমান সংকট শুধু জ্বালানি সরবরাহেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
সংকট মোকাবিলায় সরকার দেশীয় ও আমদানিনির্ভর—দুই উৎসেই জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান অর্থ উপদেষ্টা। এর অংশ হিসেবে নতুন এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণ, গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন এবং নতুন কূপ খননের মাধ্যমে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত কাটিয়ে উঠতে সরকার একাধিক বিকল্প নিয়ে কাজ করছে। সরকারি উদ্যোগ ও বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির ফলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই দেশে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।’
জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে অধ্যাপক তিতুমীর বলেন, শুধু জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রতিযোগিতামূলক ও স্থিতিশীল একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি মিশ্রণ।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নীতিসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কখনো স্বল্পমেয়াদি চিন্তা থেকে নেয়া উচিত নয়। জাতীয় স্বার্থ, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয় বিবেচনা করেই এসব নীতি নির্ধারণ করতে হবে।’
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানের পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরই কেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে।
‘শতভাগ আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরই কেবল কেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৭ সালে এটি সম্পূর্ণ কার্যক্ষম হতে পারবে। যেকোনো মূল্যে সবার আগে আমরা সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই,’ বলেন তিনি।
এলপিজির বাজার নিয়েও কথা বলেন অধ্যাপক তিতুমীর। তিনি বলেন, ভিএলসি কার্গোতে সরাসরি গ্যাস আমদানির সুযোগ তৈরি করা গেলে দেশে এলপিজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
তার ভাষ্য, সরকারি পর্যায়ে গ্যাস আমদানির নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং খোলা বাজারে এলপিজির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে।
বিগত সরকারের সময়ে জ্বালানি খাতে গড়ে ওঠা ব্যবসায়িক আধিপত্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সব ক্ষেত্রে অলিগার্কদের প্রতিষ্ঠিত করে যাওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকার সে ব্যবস্থার পরিবর্তন করে একটি প্রতিযোগিতামূলক জ্বালানি বাজার গড়ে তুলতে চায়।
জ্বালানি নিরাপত্তার সংজ্ঞা তুলে ধরে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, শুধু পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। সহজলভ্য, নির্ভরযোগ্য এবং ক্রমবর্ধমান পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি এমন অবকাঠামো দরকার, যা অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে না।
তিনি বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তার প্রকৃত অর্থ হলো সহজলভ্য, নির্ভরযোগ্য ও ক্রমবর্ধমান পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে এমন একটি স্থিতিস্থাপক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা অস্থিতিশীল আর্থিক পরিস্থিতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং বৈচিত্র্যময় বহিঃখাতের ভারসাম্যে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।’
সেমিনারে বক্তারা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট, আমদানিনির্ভরতা কমানো, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক জ্বালানির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।![]()