ভেনিসে অভিনেত্রী Azmeri Haque এর ওপর যে হামলা হয়েছে, আমি তার নিঃশর্ত নিন্দা জানাই। এর কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো “কিন্তু” নেই, কোনো প্রেক্ষাপট নেই যা একে খানিকটাও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
একদল বাংলাদেশি তাঁকে ঘিরে ধরে পানি, কোমল পানীয় ছুড়েছে, হাত থেকে ফোন ফেলে দিয়েছে, সঙ্গে থাকা ভাইয়ের স্ত্রীকে ধাক্কা দিয়েছে। পাশে দাঁড়ানো শিশুটিকেও রেহাই দেওয়া হয়নি। অপরাধ — তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান।
একজন মানুষের মত পছন্দ না হলে তার বিরুদ্ধে বলুন, লিখুন, তর্ক করুন। গায়ে হাত তোলা, ঘিরে ধরা, ভয় দেখানো — এগুলো মতপ্রকাশ নয়, এগুলো সন্ত্রাস। বিদেশের মাটিতে দল বেঁধে একজন নারীকে হেনস্তা করে কেউ কোনো রাজনৈতিক পয়েন্ট অর্জন করেননি; শুধু দেখিয়েছেন যুক্তি ফুরিয়ে গেলে কী পড়ে থাকে।
আর এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।![]()
বাঁধন পরিচিত মুখ, তাই খবরটা আমরা জেনেছি। দেশের ভেতরে যাঁরা একইভাবে আক্রান্ত হয়েছেন ভিন্নমতের কারণে, পুরোনো পরিচয়ের কারণে, কোনো এক পক্ষের “লোক” সন্দেহে — তাঁদের বেশিরভাগের নাম আমরা কোনোদিন জানি না।
গত ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২-এ কয়েকজন মানুষ ফুল দিতে গিয়েছিলেন। তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাঁদের দুজন নারী। আরও তিনজনকে মারধর করা হয়। যাঁরা মেরেছেন, তাঁরা পুলিশ নন — মব, যাঁরা নিজেরাই বিচার করে নিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়টা জুড়েই এটা চলেছে। ২০২৪-এর আগস্ট-সেপ্টেম্বর — এই দুই মাসেই সত্তরটির বেশি মাজার ও আখড়ায় হামলা হয়েছে, আগুন দেওয়া হয়েছে, লুট হয়েছে। দিনাজপুর আর রংপুরে মব এসে মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করে দিয়েছে। পত্রিকা অফিসে হামলা হয়েছে। গুজব ছড়িয়ে মানুষ পিটিয়ে মারা হয়েছে।
প্রতিটি ঘটনার কাঠামো এক: একদল মানুষ ঠিক করে নিয়েছে কে “আমাদের” আর কে নয়, কে দেশের জন্য খারাপ, নিজেরাই সে বিচার সেরে ফেলেছে। আর রাষ্ট্র হয় দেরিতে পৌঁছেছে, নয়তো পৌঁছায়নি।
এর একটা নাম আছে। ট্রাইবালিজম, গোষ্ঠীবাদ।
আর এই পথের শুরুটা সবসময় একই জায়গায় — প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে দেখা বন্ধ করে দেওয়া। প্রথমে সে ভুল, তারপর সে খারাপ, তারপর সে দেশের শত্রু, তারপর সে আর পুরোপুরি মানুষই নয়। অনেক সময় শব্দগুলো নিরীহ মনে হয়, কিন্তু প্রতিটির কাজ একটাই: একজন মানুষকে একটা লেবেলে নামিয়ে আনা। আর একবার মানুষটা লেবেল হয়ে গেলে তার গায়ে হাত তুলতে আর বিবেক লাগে না। গোষ্ঠীবাদের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হিংস্রতা নয় — শব্দ।
যুক্তিটাও তখন খুব সরল হয়ে আসে। মানুষটা কী বলছে সেটা আর বিবেচ্য নয়; সে “কোন দলের” — এটাই একমাত্র প্রশ্ন। একবার এই প্রশ্নটাই একমাত্র প্রশ্ন হয়ে গেলে প্রতিপক্ষ আর প্রতিপক্ষ থাকে না, শত্রু হয়ে যায়। আর শত্রুর সঙ্গে তর্ক করতে হয় না — তাকে শুধু থামাতে হয়। যে ভাবেই হোক।
ভিন্ন মত থাকবে। রাজনীতির লড়াই রাজনীতি দিয়েই লড়তে হবে। যুক্তি দিয়ে, সংগঠন দিয়ে, ভোটের মাঠে, প্রয়োজনে আদালতে। মব বানিয়ে নয়। যে অস্ত্র আজ আপনার পছন্দের কারও হাতে, কাল সেটা আপনার দিকেই ঘুরবে। ইতিহাসে এর ব্যতিক্রম নেই।
ডিসেম্বরে কিগালি যাচ্ছি। যে জায়গাগুলোতে যাব, তার একটি জেনোসাইড মেমোরিয়াল।
রুয়ান্ডার গণহত্যাকে আমরা “উপজাতীয় সংঘাত” বলে জানি — যেন হুতু আর তুতসি অনাদিকাল ধরে দুটো আলাদা জাত। ঘটনা তা নয়। তারা একই ভাষায় কথা বলত, একই ধর্ম পালন করত, একই গ্রামে থাকত, নিজেদের মধ্যে বিয়ে করত। বিভাজনটা তৈরি করা হয়েছিল — ঔপনিবেশিক শাসকরা পরিচয়পত্রে “হুতু” আর “তুতসি” লিখে দিয়েছিল, আর পরে রাজনীতিকরা সেই লেখাটাকে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন বানিয়ে তুলেছিলেন।
এটাই ট্রাইবালিজমের আসল চেহারা। গোত্র আগে থেকে থাকে না, বানাতে হয়।![]()
আর গোত্র বানানোর কাজটা করেছিল ভাষা। বছরের পর বছর রেডিওতে প্রতিবেশীকে বলা হয়েছে “তেলাপোকা”, নাম ধরে ধরে বলা হয়েছে কারা শত্রু, কারা দেশের বিপদ। কেউ প্রথম দিনেই মাচেটি তুলে নেয়নি। আগে তাদের বিশ্বাস করানো হয়েছে যে পাশের বাড়ির লোকটা আর মানুষ নয়, পোকা। তারপর হত্যাটা আর হত্যা থাকেনি — পরিচ্ছন্নতা হয়ে গেছে।
১৯৯৪ সালে একশ দিনে প্রাণ হারিয়েছিলেন অন্তত আট লাখ মানুষ। দিনে গড়ে আট হাজার। যারা মেরেছিল, তারা বাইরের কেউ ছিল না — প্রতিবেশী, সহকর্মী, একই স্কুলে পড়া বন্ধু। কিগালির ওই মেমোরিয়ালে আড়াই লাখেরও বেশি মানুষের দেহাবশেষ সমাহিত। বেশিরভাগেরই নাম জানা যায়নি।
আমরা সেই পথের কোথাও নেই, এবং যেন কোনোদিন না যাই। কিন্তু পথটা চিনে রাখা দরকার। কারণ ওই পথের শুরুটা সবসময় ছোট — একটা শব্দ, ছুড়ে মারা একটা বোতল, একটা ধাক্কা, একটা ভিডিওর নিচে হাততালি।
ঠিক ওখানেই থামাতে হয়। ভেনিসে যা হয়েছে, তার নিন্দা করার জন্য কারও রাজনৈতিক পরিচয় লাগে না। শুধু মানুষ হলেই যথেষ্ট।![]()