ফজলুল হক
প্রশাসক, এফবিসিসিআই
প্রতিষ্ঠাতা, প্লামি ফ্যাশনস
এফবিসিসিআইর প্রশাসক ও প্লামি ফ্যাশনসের প্রতিষ্ঠাতা ফজলুল হক দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান সংকট নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং চাপ, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, গ্যাসের বিল, সবুজ শিল্প এবং এফবিসিসিআই নির্বাচন সব বিষয়ে তিনি সরাসরি মত দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যগুলো নিয়ে সাজিয়ে প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো।
“আমলাতান্ত্রিক জটিলতাই ব্যবসার এক নম্বর স্থায়ী বাধা”
দেশে ব্যবসা পরিচালনার সবচেয়ে বড় সমস্যা কী—এই প্রশ্নের উত্তরে ফজলুল হক বলেন, সাময়িক সংকট অনেক আসে, কিন্তু একটি সমস্যা শুরু থেকেই রয়ে গেছে।
“এ মুহূর্তে বড় সংকটের কথা বললে জ্বালানি আসবে, এরপর হয়তো ব্যাংক খাত। কিন্তু ব্যবসার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যে সমস্যাটি রয়ে গেছে, সেটি হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা।”
তিনি আরও বলেন,
“জন্ম থেকেই জ্বলছি, বাকি জীবনও জ্বলতে হবে—ব্যাপারটা অনেকটা এ রকম।”
তাঁর ভাষায়, টেলিফোন কিংবা ফ্যাক্স লাইনের জন্য অপেক্ষার সময়ও ব্যবসায়ীরা কাজ চালিয়ে গেছেন, কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা আজও দূর হয়নি। তাই এটিই ব্যবসার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবন্ধকতা।
“ব্যক্তিগত ফোনে নয়, সেবা হতে হবে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে”
সরকার ব্যবসা সহজীকরণের কথা বলছে, তবে বাস্তবতায় সেটি কতটা কার্যকর—সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
“উপদেষ্টাদের সঙ্গে হয়তো বড় ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ আছে। ফোন করলে দু-একদিনে সমাধান হয়ে যেতে পারে, কিন্তু এভাবে কতবার সম্ভব?”
তিনি স্পষ্ট করে বলেন,
“প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা ব্যক্তিভিত্তিক ফোনে হতে পারে না।”
ফজলুল হকের মতে, কোনো ব্যবসায়ীর কাগজপত্রে সমস্যা থাকলে সেটি দ্রুত জানিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে একটি কারখানা পরিদর্শনের ফাইলের প্রক্রিয়া শুরু হতেও তাঁর ৩২ দিন লেগেছে।
“অনুমোদন হলো কি হলো না, সেটা বলছি না। কাজ শুরু হতেই এক মাসের বেশি চলে গেছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।”
তিনি মনে করেন, শুধু টাস্কফোর্স গঠন করলেই হবে না; কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি সম্ভব নয়।![]()
“প্রতিবাদ করলে আরও হয়রানির ভয় থাকে”
সাধারণ ব্যবসায়ীরা কেন অভিযোগ করেন না—এরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন এফবিসিসিআই প্রশাসক।
“প্রতিবাদ করলে পরবর্তী সময়ে আরও বেশি হয়রানির শিকার হওয়ার ভয় থাকে।”
তাঁর মতে, কাগজে-কলমে অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকলেও বাস্তবে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পক্ষে সেই পথ অনুসরণ করা সহজ নয়। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আমলাতান্ত্রিক হয়রানি বন্ধে আরও কঠোর হতে হবে।
“উৎপাদন বন্ধ হলেও বেতন ও সুদের চাকা থামে না”
সাম্প্রতিক গ্যাস সংকট শিল্পে কী ধরনের চাপ তৈরি করেছে, তা তুলে ধরে তিনি বলেন,
“কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে কিছু খরচ কমানো সম্ভব হলেও শ্রমিকের বেতন আর ব্যাংকের সুদের চাকা থামানো যায় না।”
তিনি অভিযোগ করেন, পুরো আগস্ট মাস গ্যাস না পেলেও সেপ্টেম্বরে অনেক কারখানাই স্বাভাবিক মাসের মতো বিল পাবে।
“অনেক সময় কম গ্যাসের চাপে লাইনে বাতাস ঢোকে, অথচ বিলে কোনো তফাত হয় না। এটি উদ্যোক্তাদের জন্য বোঝার ওপর শাকের আঁটি।”
তাঁর প্রস্তাব, সরকার আগস্টে যে শিল্প যত শতাংশ গ্যাস পেয়েছে, সেই অনুপাতে বিল নিক। এতে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন এবং বুঝবেন সরকার তাদের পাশে আছে।
“ডায়িং কারখানায় একবার গ্যাস বন্ধ মানেই পুরো ব্যাচ নষ্ট”
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ক্ষতি উৎপাদনের ধারাবাহিকতায় হয়েছে বলে জানান তিনি।
“টেক্সটাইল ডায়িং বা সিরামিকের মতো কারখানায় একটানা ১০ ঘণ্টা প্রক্রিয়াকরণ চালাতে হয়। মাঝে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হলে পুরো ব্যাচের পণ্যের গুণমান নষ্ট হয়ে যায়।”
তিনি বলেন, এই ক্ষতি অপূরণীয়। তাই তিতাসসহ গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত প্রকৃত ব্যবহারের ভিত্তিতে বিল নেওয়া এবং ব্যাংক ঋণের কিস্তি ও গ্যাস বিল পরিশোধের সময় বাড়ানো।
“আগে চলমান কারখানা বাঁচান, তারপর বন্ধ কারখানা চালু করুন”
বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর সরকারি উদ্যোগ নিয়েও সতর্ক করেছেন ফজলুল হক।
“আগে যে কারখানাগুলো চালু আছে, যারা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, নিশ্চিত করতে হবে সেগুলো যেন বন্ধ না হয়।”
তিনি আরও বলেন,
“বন্ধ কারখানা চালু করলেই সেটি স্বাভাবিকভাবে চলতে পারবে, সেটাও কিন্তু বড় প্রশ্ন।”
তাঁর মতে, সীমিত জ্বালানি সরবরাহের মধ্যে কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা নিয়ে জরুরি রেশনিং পরিকল্পনা থাকা দরকার।
“সবুজ কারখানা আমরা করেছি, দাম আদায় করতে পারিনি”
বাংলাদেশের সবুজ শিল্প নিয়ে তিনি গর্ব প্রকাশ করলেও স্বীকার করেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তার আর্থিক সুবিধা মিলেনি।
“বাংলাদেশে যখন প্রথম দিককার সবুজ কারখানা করা শুরু হয়, তখন ক্রেতাদের কোনো চাপ ছিল না।”
রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর দেশের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
“আজ বাংলাদেশে প্রায় ৩০০টি নিবন্ধিত পরিবেশবান্ধব কারখানা রয়েছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ।”
তবে তাঁর স্বীকারোক্তি,
“প্রত্যাশিত দাম আমরা পাইনি। হয়তো ক্রেতাদের কাছ থেকে সেটা আদায় করতে পারিনি, আমাদেরও আর্থিক ব্যর্থতা আছে।”
“শিল্প সরবে না, কিন্তু আত্মতুষ্টির সুযোগও নেই”
বাংলাদেশ থেকে পোশাক শিল্প অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রসঙ্গে তিনি আশাবাদী।
“নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে শিল্প সরে যাওয়ার মতো কোনো সম্ভাবনা আমি দেখছি না।”
তবে একই সঙ্গে সতর্ক করেন,
“খরগোশ ও কচ্ছপের গল্পের মতো ঘুমিয়ে পড়লে চলবে না।”
তাঁর মতে, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো দ্রুত সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। তাই বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
“সরকারের নীতির বিরোধিতা মানেই সরকারবিরোধিতা নয়”
এফবিসিসিআই ভবিষ্যতে কতটা স্বাধীনভাবে সরকারের সমালোচনা করবে—এ প্রশ্নে তিনি পরিষ্কার অবস্থান দেন।
“নীতির বিরোধিতা করা আর সরকারের বিরোধিতা করা এক নয়।”
তিনি বলেন, কোনো নীতি ভুল মনে হলে ব্যবসায়ীরা যুক্তি দিয়ে তা তুলে ধরবে। অতীতের উদাহরণ হিসেবে ২০০৪ সালে বেনাপোল দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরোধিতার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, যুক্তিনির্ভর আলোচনার পরই সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয়েছিল।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন তিনি—
“কোনো সরকারি নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেই তাকে সরকারবিরোধী বা বিরোধী দলের ট্যাগ দেওয়া ঠিক নয়।”
তাঁর মতে, সরকার ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষই ভুল করতে পারে। তাই দমন-পীড়নের বদলে উন্মুক্ত সংলাপই হওয়া উচিত সমস্যার সমাধানের পথ।
“নির্বাচনে কে জিতল, সেটি নয়—নিরপেক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ”
এফবিসিসিআই নির্বাচনের বিষয়ে ফজলুল হক বলেন, তাঁর লক্ষ্য অর্থ ও প্রভাবমুক্ত একটি নির্বাচন।
“আমরা একটি অর্থ ও প্রভাবমুক্ত ভালো নির্বাচন উপহার দিতে পারব বলে আশাবাদী।”
তবে বিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়ায় তাঁর চার মাসের মেয়াদে নির্বাচন সম্পন্ন নাও হতে পারে বলে জানান তিনি। এরপরও নির্বাচন বোর্ড ও আপিল বোর্ড গঠন করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করার প্রতিশ্রুতি দেন।
সবশেষে দেশের ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তাঁর আহ্বান—
“ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত সব মতভেদ দূরে সরিয়ে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্মে সবাই একতাবদ্ধ হন।”
তিনি বলেন,
“কে জয়ী হলেন বা পরাজিত হলেন, তার চেয়ে নির্বাচনটি কতটা নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হলো, সেটিই আসল।”