প্রায় তিন বছর পর যুক্তরাজ্যের আবাসনবাজারে বাড়ির দামে বার্ষিক পতন দেখা দিয়েছে। উচ্চ বন্ধকি ঋণের সুদ, মূল্যস্ফীতির চাপ, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে লন্ডন ও ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বাড়ির দাম কমেছে বেশি।
যুক্তরাজ্যের ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান লয়েডসের মাসিক সূচক অনুযায়ী, আগস্টে দেশটিতে বাড়ির গড় দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৪৬৮ পাউন্ড। জুলাইয়ের তুলনায় দাম কমেছে দশমিক ২ শতাংশ বা ৬৮৫ পাউন্ড। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দাম কমেছে দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৩ সালের নভেম্বরের পর এটিই প্রথম বার্ষিক পতন।
আগস্টে বাড়ির দাম দশমিক ২ শতাংশ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন রয়টার্সের জরিপে অংশ নেয়া অর্থনীতিবিদরা। ফলে বাস্তবে দাম কমে যাওয়ায় আবাসনবাজারের দুর্বলতা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হয়েছে।
লয়েডসের পরিচালক অ্যান্ড্রু আসাম বলেন, ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের ব্যয় ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে যুক্তরাজ্যের আবাসনবাজার এখন অনেকটাই স্থবির।’
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সুদহার আরো বাড়তে পারে—এমন প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আবাসন ঋণের বাজারে।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান মানিফ্যাক্টসের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার যুক্তরাজ্যে দুই বছরের নির্দিষ্ট হারের আবাসন ঋণের গড় সুদহার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। পাঁচ বছরের ঋণের গড় সুদহার ছিল ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। বছরের শুরুতে দুই ধরনের ঋণের গড় সুদই ৫ শতাংশের নিচে ছিল।
সুদের হার বাড়ায় বাড়ি কেনার জন্য ঋণ নেয়া ক্রেতাদের ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ আয় ও অর্থনীতির গতিপথ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। লয়েডসের তথ্য অনুযায়ী, আবাসন ঋণের অনুমোদনও ২০২৪ সালের শুরুর পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
উত্তর লন্ডনের আবাসন ব্যবসায়ী জেরেমি লিফ বলেন, ‘ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ক্রেতারা অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে বিক্রেতাদের অনেকেই মনে করছেন, তারা এরই মধ্যে যতটা সম্ভব দাম কমিয়েছেন।’
তবে যুক্তরাজ্যের সব অঞ্চলে একই চিত্র দেখা যায়নি। উত্তর আয়ারল্যান্ডে এক বছরে বাড়ির দাম ৬ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে গড় ২ লাখ ৩১ হাজার ২৪৫ পাউন্ড হয়েছে। স্কটল্যান্ডে দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। সেখানে গড় বাড়ির দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৩৭ পাউন্ড। ওয়েলসে দাম বেড়েছে দশমিক ৬ শতাংশ, গড় দাম হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার ২৮২ পাউন্ড।
ইংল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যেও দামের প্রবণতায় বড় পার্থক্য রয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাড়ির দাম ২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ২ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে দাম কমেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। এ অঞ্চলে বাড়ির গড় দাম ৩ লাখ ৮১ হাজার ৭২৯ পাউন্ড।
আবাসনবাজারের ওপর চাপের অন্যতম কারণ হিসেবে উচ্চ বন্ধকি ঋণের সুদ, জ্বালানি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা এবং ভোক্তাদের সতর্ক ব্যয়ের কথা বলছেন বিশ্লেষকরা।
আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বিশ্লেষক অ্যান্থনি কোডলিং বলেন, ‘উচ্চ বন্ধকী ঋণের সুদ, জ্বালানি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা ও মানুষের সতর্ক ব্যয়ের কারণে আবাসনবাজার বিভিন্ন দিক থেকে চাপে রয়েছে।’
বাড়ির দাম কমলেও ঋণের ব্যয় এখনো তুলনামূলকভাবে বেশি থাকায় ক্রেতাদের জন্য আবাসন কেনার সিদ্ধান্ত সহজ হয়নি। একই সঙ্গে বিক্রেতারাও দাম কমাতে অনাগ্রহী। ফলে লেনদেন কমে গিয়ে বাজারে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সুদহার, মূল্যস্ফীতি ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির গতিপথই আগামী মাসগুলোতে যুক্তরাজ্যের আবাসনবাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
![]()