যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় আবারও বাড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, আমদানিতে শুল্কের প্রভাব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামো ঘিরে ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের বাড়তি চাহিদা—সব মিলিয়ে মার্কিন উৎপাদন খাতের সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন ব্যয়চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট ফর সাপ্লাই ম্যানেজমেন্ট (আইএসএম) প্রকাশিত আগস্টের উৎপাদন খাতের জরিপে দেখা গেছে, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির প্রবণতা টানা ২৩ মাস অব্যাহত রয়েছে। আগস্টে প্রতিষ্ঠানটির প্রাইসেস ইনডেক্স ৭১ দশমিক ১ শতাংশে ছিল, যা জুলাইয়ের সমান। জরিপে উৎপাদন খাতের ১৫টি শিল্প কাঁচামালের দাম বাড়ার কথা জানিয়েছে। বিপরীতে কোনো শিল্পই কাঁচামালের দাম কমার কথা জানায়নি।
আইএসএমের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে যেসব শিল্পে কাঁচামালের দাম বেড়েছে তার মধ্যে রয়েছে টেক্সটাইল, কাঠ, প্রাথমিক ধাতু, আসবাব, ধাতব পণ্য, কাগজ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, পরিবহন সরঞ্জাম, কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিক পণ্য, প্লাস্টিক ও রাবার, রাসায়নিক এবং খাদ্য ও পানীয় শিল্প। স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানিতে শুল্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের ব্যয় বাড়াকে এ প্রবণতার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে আইএসএম।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) আগস্টের প্রডিউসার প্রাইস ইনডেক্সেও একই ধরনের চাপ দেখা গেছে। এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন খাতের মধ্যবর্তী পর্যায়ের প্রক্রিয়াজাত পণ্যের দাম ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অপরিশোধিত মধ্যবর্তী পণ্যের দাম ১২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। আগস্টে প্রক্রিয়াজাত মধ্যবর্তী পণ্যের দাম এক মাসেই বেড়েছে ১ দশমিক ৮ শতাংশ। এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধির পেছনে ডিজেল জ্বালানির দাম ২৪ দশমিক ১ শতাংশ বাড়ার ভূমিকা ছিল।
শিল্পের আরেকটি বড় চাপ তৈরি হয়েছে ইলেকট্রনিক উপকরণে। আইএসএমের আগস্ট জরিপে ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট, মেমোরি কম্পোনেন্ট, প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড ও সেমিকন্ডাক্টরকে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট ও মেমোরি-সংক্রান্ত কিছু উপকরণকে স্বল্প সরবরাহের তালিকাতেও রাখা হয়েছে। এআই অবকাঠামো নির্মাণে সার্ভার, প্রসেসর ও মেমোরি চিপের চাহিদা দ্রুত বাড়ায় এসব উপকরণের বাজারে চাপ তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানি ব্যয়ও শিল্পের ব্যয় কাঠামোকে আরও কঠিন করছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৬ দশমিক ২৯ ডলারে উঠেছে, যা এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ৬৮ শতাংশ বেশি। কৃষি ও পণ্য পরিবহনের মতো জ্বালানিনির্ভর খাতগুলোতে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে তা সরবরাহ শৃঙ্খলের অন্যান্য পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমদানি ব্যয়। বিএলএসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি মূল্য মাসিক হিসাবে ০ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে এবং এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৭ শতাংশ। আমদানিকৃত মূলধনী পণ্যের দাম ০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং খাদ্য ও জ্বালানি বাদে মূল আমদানি মূল্য ১২ মাসে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।
ফলে মার্কিন শিল্পে এখন উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের দ্বৈত চাপ তৈরি হয়েছে। এআইনির্ভর বিনিয়োগ কিছু শিল্পে চাহিদা বাড়ালেও জ্বালানি, কাঁচামাল, পরিবহন ও ইলেকট্রনিক উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয়ের চাপ কমছে না। ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ফেডারেল রিজার্ভের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের কারখানা উৎপাদন ০ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে—টানা সাত মাস বৃদ্ধির পর যা প্রথম পতন।![]()