রাজু আলীম
সম্পাদক, ইউএসএ বাংলা নিউজ
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানকে ঘিরে যে আলোচনা নতুন করে কেন্দ্রে এসেছে, তা কেবল একজন দলের নেতাকে ঘিরে নয় বরং রাষ্ট্র ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ পথকে কেন্দ্র করে। দেশের প্রধান দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক কলাম ও মতামত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারেক রহমানের রাজনীতি, তার বক্তব্যের ভাষা, দীর্ঘ নির্বাসনের অভিজ্ঞতা এবং স্বদেশে ফিরে দেওয়া সংযত ও পরিমিত ভাষণকে অনেক লেখকই একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক মোড় হিসেবে দেখছেন। এই বিশ্লেষণগুলোতে সমালোচনাও আছে, সন্দেহও আছে, আবার একই সঙ্গে আছে একটি প্রশ্ন! বাংলাদেশ কি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ঐক্যভিত্তিক রাজনীতির দিকে যেতে পারবে এবং সেই প্রক্রিয়ায় তারেক রহমান কী ভূমিকা রাখতে যাচ্ছেন। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরেই উত্তপ্ত ও বিভক্ত। নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে আস্থার সংকট, বিরোধী রাজনীতির পরিসর সংকোচন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক এবং নাগরিক অধিকার প্রশ্নে উদ্বেগ, সবকিছু মিলিয়ে রাজনীতি অনেকটা প্রতিপক্ষনির্ভর সংঘাতের কাঠামোয় আটকে। বিভিন্ন পত্রিকার কলামে বারবার বলা হয়েছে, এই বাস্তবতায় নতুন কোনো রাজনৈতিক ভাষা না এলে রাজনীতি একই বৃত্তে ঘুরপাক খেতে থাকবে। তারেক রহমানের ফিরে আসা ও তার সাম্প্রতিক বক্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক এমন একটি প্রেক্ষাপটে দেখছেন, যেখানে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। এই পরিবর্তনের ডাক দিয়ে তিনি গত ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে ঢাকার ‘জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে’তে আয়োজিত জনসমাবেশে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “উই হ্যাভ আ প্ল্যান। আমি কোনো স্বপ্নের কথা বলছি না, আমি আপনাদের সামনে একটি বাস্তব পরিকল্পনার কথা বলছি।”
![]()
তারেক রহমানের রাজনীতির একটি বড় অংশ জুড়ে আছে তাঁর দীর্ঘ নির্বাসনের অভিজ্ঞতা। প্রায় সতেরো বছর দেশের বাইরে থেকে রাজনীতি করা একজন নেতার ক্ষেত্রে এটি শুধু ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনা নয়, বরং রাজনৈতিক চিন্তারও এক ধরনের রূপান্তরের সময়। পত্রিকার কলামগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই দীর্ঘ সময় তাঁকে আবেগপ্রবণ বক্তব্যের রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে এনে কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। তাঁর বক্তব্যে এখন ব্যক্তিগত আক্রমণের বদলে প্রতিষ্ঠান, ব্যবস্থা এবং সংস্কারের প্রসঙ্গ বেশি উঠে আসে। যা আগের সময়ের সঙ্গে একটি স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করে। বিশেষ করে তাঁর ঘোষিত ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়, বরং এটি একটি নতুন সামাজিক চুক্তির প্রস্তাব। এই কর্মসূচির ১ নম্বর দফায় তিনি উল্লেখ করেছেন, “প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে সব মত ও পথের সমন্বয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে।” স্বদেশে ফিরে তাঁর সেই ১৭ মিনিটের ভাষণকে অনেক কলামিস্ট একটি পরিমিত ও হিসাবি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। ভাষণটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে অতীতের ক্ষোভ বা প্রতিশোধের ভাষা অনুপস্থিত ছিল। বরং তিনি কথা বলেছেন গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ভোটাধিকার, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা নিয়ে। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন, “আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না, বিচার হবে কেবল আইনি প্রক্রিয়ায়।” কয়েকটি দৈনিকের মতামত পাতায় লেখা হয়েছে, এই ভাষণ উত্তেজনা তৈরির বদলে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার কথা বলেছে, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে বিরল।
তারেক রহমানের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইতিবাচক রাজনীতির ধারণা। বিভিন্ন কলামে বলা হয়েছে, তিনি সরাসরি কোনো প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার না করে একটি নৈতিক ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণের কথা বলেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, “আমরা যে ধর্মের মানুষই হই, আমরা যে শ্রেণির মানুষই হই, আমরা যে দলের রাজনৈতিক কর্মী হই বা একজন নির্দলীয় নাগরিক হই, আমাদের সবাইকে যেকোনো মূল্যে এই দেশের শান্তি-শৃঙ্খলাকে ধরে রাখতে হবে।” এই ইতিবাচক ধারাকে অনেক লেখক বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রয়োজনীয় পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি যে বিভাজন ও বিদ্বেষের ভাষায় আটকে ছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে এমন একটি ভাষাই দরকার, যেখানে প্রতিপক্ষ মানে শত্রু নয়, বরং ভিন্নমত পোষণকারী রাজনৈতিক অংশীদার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐক্যের প্রশ্নে তারেক রহমানের অবস্থান নিয়ে পত্রিকাগুলোতে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে যে রাষ্ট্রের সংকট মোকাবিলায় কেবল একক দলের শক্তি যথেষ্ট নয়। গণতন্ত্র টেকসই করতে হলে রাজনৈতিক ঐকমত্য, ন্যূনতম সমঝোতা এবং পারস্পরিক সহনশীলতা প্রয়োজন। এই ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের এক ভাষণে বলেছিলেন, “যদি আপনি অতীতে আটকে থাকেন, তবে আপনার এক চোখ অন্ধ; আর যদি আপনি অতীতকে পুরোপুরি ভুলে যান, তবে আপনার দুই চোখই অন্ধ।” কয়েকজন কলামিস্ট লিখেছেন, এই বক্তব্য বাস্তবে রূপ পেলে তা বড় পরিবর্তন আনতে পারে, কারণ এখানে ঐক্যকে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়েছে, শক্তি হিসেবে নয়।
![]()
তারেক রহমানের রাজনীতিকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে অনেক লেখক তাঁর অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি ধারাবাহিকতার কথাও উল্লেখ করেছেন। ২০০০-এর দশকের শুরুতে চ্যানেল আই এ দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকার ও সাম্প্রতিক বক্তব্যের মধ্যে তুলনা করে বলা হয়েছে, তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিলো, রাজনীতি আদর্শের বিষয়, পেশা নয়। সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং অবস্থান বলছে, এটি এখনো অপরিবর্তিত। তবে ভাষা ও উপস্থাপনায় এসেছে পরিণতি। এই পরিণত ভাষাই তাঁকে একটি ‘ম্যাচিউর’ রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে তুলে ধরছে। তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশ্নেও অত্যন্ত আধুনিক ও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। হিন্দু প্রতিনিধিদের এক সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, “নিজেদের সংখ্যালঘু ভাববেন না। এই দেশের মাটির ওপর আপনাদেরও সমান অধিকার। আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ব যেখানে একজন মা, একজন নারী বা একজন শিশু নিরাপদে ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে।” বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের দর্শন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ কতটুকু হবে তা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। কিছু কলামে বলা হয়েছে, দীর্ঘ নির্বাসনের ফলে বাংলাদেশে অবস্থান করার ফলে বর্তমানে চলে আসা রাজনৈতিক আবহ ও অপরাজনীতির চ্যালেঞ্জ তাঁকে সরাসরি মোকাবিলা করতে হয়নি। ফলে তাঁর বক্তব্য ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবার আশঙ্কাও উধা হয়ে যায় না। তবে একই সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের গভীরতায় নতুন কোনো চিন্তার প্রয়োজন আছে এবং তারেক রহমানের ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ ও ‘দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ’ গঠনের প্রস্তাব সেই চিন্তার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।
জুলাই আন্দোলন ও সাম্প্রতিক গণআন্দোলন প্রসঙ্গে তারেক রহমানের অবস্থান কলামগুলোতে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি এই আন্দোলনগুলোকে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে না দেখে নাগরিক চেতনার প্রকাশ হিসেবে দেখেছেন। তিনি এই গণঅভ্যুত্থানকে ঐতিহাসিক হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, “২০২৪ সালে ছাত্র-জনতা বুকের রক্ত দিয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছে।” এই দৃষ্টিভঙ্গিকে অনেক লেখক ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, কারণ এতে রাজনীতি ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়। রাজনীতি যদি জনগণের কণ্ঠকে শোনার জায়গা তৈরি করতে পারে, তবে সেটিই হবে গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি। সব মিলিয়ে দেশের প্রধান পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত তারেক রহমান সম্পর্কিত কলামগুলো থেকে একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায়। ঐক্য, সহনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের যে কথা তিনি বলেছেন, তা যদি বক্তব্যের বদলে বাস্তব রাজনীতিতে প্রতিফলিত হয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতি একটি ভিন্ন পথে হাঁটার সুযোগ পেতে পারে। ইতিহাস প্রমাণ করে, ঐক্য কখনো একদিনে তৈরি হয় না। তবে সঠিক ভাষা ও সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তার সূচনা করা যায়। তারেক রহমানের রাজনীতি আজ ঠিক সেই সূচনার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে—এটি সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে তিনি ও তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজনীতি কতটা ধারাবাহিকভাবে এই ইতিবাচক ধারাকে ধরে রাখতে পারে তার ওপর। এ পথকে এগিয়ে নিতে বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কথার সাথে মিলিয়ে পুত্র তারেক রহমানের সেই অমোঘ শ্লোগানটিই রাজনীতির নতুন মোড় নির্দেশ করছে: “ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়, আর সবার উপরে বাংলাদেশ।”