ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে ড্রোন হামলার পর ইউরোপে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো। আগামী অক্টোবর মাসে ইউরোপের শোধনাগারগুলোয় সরবরাহ বাতিল করা হলেও একই সময়ে এশিয়ার বাজারে তেল রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে কোম্পানিটি। ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রবাহে নতুন করে আঞ্চলিক ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, অন্তত দুটি ইউরোপীয় শোধনাগারকে অক্টোবর মাসে সৌদি আরব থেকে কোনো অপরিশোধিত তেল সরবরাহ না করার কথা জানিয়েছে আরামকো। এ সিদ্ধান্ত শুধু ওই দুটি প্রতিষ্ঠান নয়, ইউরোপের অন্যান্য ক্রেতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির আওতায় ইউরোপের বিভিন্ন শোধনাগার সাধারণত সৌদি আরব থেকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। এসব তেলের একটি অংশ লোহিত সাগরের সিদি কেরির বন্দর হয়ে ইউরোপে যায়। বন্দরটি সুমেদ পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত। অক্টোবরে সৌদি সরবরাহ বন্ধ থাকলে ইউরোপীয় শোধনাগারগুলোকে বিকল্প উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করতে হবে। এতে অঞ্চলটির তেল বাজারে সরবরাহ ব্যয় ও প্রতিযোগিতার ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে।
গত সপ্তাহে ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ করে দেয়। পেট্রোলাইন নামে পরিচিত এ পাইপলাইন দেশটির পূর্বাঞ্চলের প্রধান তেল উৎপাদন এলাকা থেকে লোহিত সাগরের উপকূলে অপরিশোধিত তেল পরিবহন করে। এর কৌশলগত গুরুত্ব হলো, এ পথ ব্যবহার করে সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রফতানি করতে পারে।
পাইপলাইনটি আংশিকভাবে চালু করতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে আগে ধারণা করা হয়েছিল। তবে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে প্রায় ছয় সপ্তাহ প্রয়োজন হতে পারে। এ অবস্থায় ইউরোপের কয়েকটি শোধনাগার ইতিমধ্যে বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। পোল্যান্ডের শোধনাগার প্রতিষ্ঠান অরলেনও বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১০টির বেশি দরপত্র আহ্বান করেছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জুনে ওইসিডিভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ লাখ ৭৭ হাজার ব্যারেল সৌদি অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। ফলে অক্টোবরের সরবরাহ বন্ধের প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি শোধনাগারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ইউরোপের বৃহত্তর তেল সরবরাহ ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ইউরোপে সরবরাহ কমালেও এশিয়ার বাজারে সৌদি তেলের প্রবাহ বাড়ছে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের জন্য সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে প্রায় ৬ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিক্রি হয়েছে। এসব তেলের একটি অংশ ওমানের সোহার বন্দরের কাছে জাহাজ থেকে জাহাজে স্থানান্তরের মাধ্যমে এশিয়ার ক্রেতাদের কাছে পাঠানো হচ্ছে।
চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও জাপানের শোধনাগারগুলো এসব তেলের প্রধান ক্রেতা। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সৌদি আরবের দৈনিক তেল রফতানি ১০ থেকে ১৫ লাখ ব্যারেলে উন্নীত হতে পারে। এর মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে কমে যাওয়া রফতানির একটি অংশ পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে সৌদি আরব।
জাপানের পেট্রোলিয়াম অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান শুনিচি কিটো জানিয়েছেন, নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত জাপানের জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছে। ফলে সৌদি আরবের রফতানি কৌশলের তাৎক্ষণিক প্রভাব এশিয়ার বাজারে তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকতে পারে। তবে ইউরোপমুখী সরবরাহ বন্ধ এবং এশিয়ায় রফতানি বাড়ানোর ফলে বৈশ্বিক বাজারে তেলের প্রবাহের পুনর্বিন্যাস কতটা স্থায়ী হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।![]()