বাংলাদেশের এলএনজি অবকাঠামোতে নতুন বিনিয়োগ ও সরবরাহ নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির পর চীনা একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ এগিয়েছে। এর মধ্যেই রাশিয়ার নোভাটেকের পক্ষ থেকে মহেশখালীতে স্থায়ী এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব এসেছে। ফলে দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাস ঘাটতি মেটাতে আমদানি অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি কোন অংশীদার ও কোন ধরনের প্রকল্প নেওয়া হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমতে থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের চাহিদা মেটাতে আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। বর্তমানে মাসে প্রায় ১০ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। প্রতিটি কার্গোর পেছনে ব্যয় হচ্ছে আনুমানিক ১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু এলএনজি আমদানিতেই মাসে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন আরও কমলে আমদানির পরিমাণ বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।
মহেশখালীতে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ রয়েছে। এর একটি এক্সিলারেট এনার্জির এবং অন্যটি সামিট পাওয়ারের। দুটি টার্মিনালই পরিচালনা করছে এক্সিলারেট এনার্জি। এগুলোর সম্মিলিত সর্বোচ্চ গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সাম্প্রতিক হিসাবে দুই টার্মিনাল থেকে একদিনে প্রায় ৯৯৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে।![]()
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গানভরের সরবরাহ করা এলএনজির প্রথম কার্গো ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে পৌঁছেছে। সামিটের টার্মিনালে ভেড়ানো ওই কার্গোতে ছিল প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ ঘনমিটার এলএনজি। এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বরও একটি কার্গো দেশে আসে। পরপর এসব চালান আসায় সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে।
তবে বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা সামাল দেওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ কারণেই মহেশখালীতে নতুন একটি এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতার এই টার্মিনাল নির্মাণে চীনের চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানির (সিএনইই) সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
গত ৮ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, গ্যাস সংকট মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে নতুন এফএসআরইউ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য দেড় বছরের মধ্যে টার্মিনালটি পাওয়ার।
তবে নতুন এফএসআরইউ স্থাপন করলেই সরবরাহ সংকট পুরোপুরি কাটবে না। আমদানি করা গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে প্রয়োজন হবে পর্যাপ্ত সঞ্চালন অবকাঠামো ও পাইপলাইন। অর্থাৎ টার্মিনাল নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাইপলাইন সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ব্যয় হলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে শিল্প ও অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়, সেটিও হিসাবের মধ্যে রাখার কথা জানিয়েছে সরকার।![]()
এর মধ্যেই রাশিয়ার নোভাটেকের পক্ষ থেকে এসেছে ভিন্ন ধরনের প্রস্তাব। পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতে নোভাটেকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান নোভাটেক মিডলইস্ট মহেশখালীতে গ্র্যাভিটি বেইজড স্ট্রাকচার বা জিবিএসের মাধ্যমে স্থায়ী এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পটির অর্থায়ন, এলএনজি সংগ্রহ, টার্মিনাল নির্মাণ এবং পরবর্তী পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। সমুদ্রের তলদেশে স্থাপন করা ভারী কংক্রিট কাঠামোর ওপর টার্মিনালটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভাসমান এফএসআরইউর তুলনায় এ ধরনের স্থাপনা সমুদ্রের ঢেউ ও ঝড়ের প্রভাবে কম নড়াচড়া করবে। টার্মিনালে প্রায় এক মাসের প্রয়োজন মেটানোর মতো গ্যাস মজুত রাখার ব্যবস্থার কথাও প্রস্তাবে রয়েছে।
নোভাটেকের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রায় ৩২ মাস সময় লাগতে পারে। এতে বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ডলার। টার্মিনালটির দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা ৯৫০ থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট করার প্রস্তাব দিয়েছে কোম্পানিটি।
এলএনজি খাতে একাধিক দেশের কোম্পানির আগ্রহকে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেই দেখছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে এলএনজি অবকাঠামো নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়মিত প্রস্তাব দিয়ে থাকে। কোন প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে, সেটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্তের বিষয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বি. ডি. রহমত উল্লাহর মতে, নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব যাচাই করা প্রয়োজন। তবে গ্যাসের ঘাটতি মোকাবেলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশের জন্য এখন মূল প্রশ্ন শুধু কত দ্রুত নতুন এলএনজি টার্মিনাল যুক্ত করা যায়, তা নয়। আমদানিনির্ভর গ্যাস ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি মূল্য, সরবরাহের নিশ্চয়তা, অবকাঠামো ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং প্রকল্পের বাণিজ্যিক শর্ত—সবকিছুর সমন্বিত মূল্যায়নও জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার কোম্পানিগুলোর আগ্রহ সেই সিদ্ধান্তকে একই সঙ্গে জ্বালানি ও কূটনৈতিক বিবেচনার বিষয় করে তুলছে।![]()