সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলকে যুক্ত করে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়া, নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ নিয়েও তাঁরা মতামত দিয়েছেন।
রোববার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সাংবাদিক সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের মতবিনিময় সভায় এসব পরামর্শ দেওয়া হয়। কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় বিশেষ কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সাকিলা ফারজানা এবং মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বৈঠকে ছিলেন।
সম্পাদক ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর, দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, নিউ নেশনের সম্পাদক মোকাররম হোসেন, ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, কালবেলার সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, মানবকণ্ঠের সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ কামাল খান, বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক আবদুল হাই সিদ্দিক, নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলি, আমার দেশের যুগ্ম সম্পাদক এম আব্দুল্লাহ এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন।
এ ছাড়া সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক মহাসচিব আব্দুল আজিজ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান, বাংলাদেশ পার্লামেন্ট জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন জামিল ও সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী খান এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সাবেক সভাপতি খাজা মাইন উদ্দিন ও সভাপতি দৌলত আক্তার মালাসহ সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
রুদ্ধদ্বার এই বৈঠকে সম্পাদক ও সাংবাদিকেরা সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত ও পরামর্শ দেন। তাঁদের অন্যতম প্রধান প্রস্তাব ছিল, বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। তাঁরা বলেন, সংবিধানের মতো মৌলিক বিষয়ে সংশোধনের উদ্যোগ যতটা সম্ভব রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল না থাকায় এ প্রক্রিয়ায় তাদের যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা।
সভায় বলা হয়, অতীতে সংবিধান সংশোধনের কিছু উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। এবার সংশোধনের আলোচনা শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মতামত নিয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার বিষয়েও মতামত দেন সম্পাদক ও সাংবাদিকেরা। কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারের একক নিয়ন্ত্রণের বাইরে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের ব্যবস্থা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর সাংবিধানিক সুরক্ষার পরামর্শ দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদ একই ব্যক্তির হাতে না রাখার বিধান করার প্রস্তাবও আসে বৈঠকে। এ ছাড়া ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঠেকাতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন কেউ কেউ।
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হয়। রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে এ ব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণের পরামর্শ দেন অনেক সম্পাদক ও সাংবাদিক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে না রাখা এবং বিচার বিভাগকে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার পরামর্শও এসেছে বলে সভা সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হয়। উচ্চকক্ষ করা হলে সেখানে শুধু নিম্নকক্ষের আসনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব না রেখে ভিন্নমত ও বিরোধী দলের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়ে মতামত দেন কয়েকজন সাংবাদিক।
মিডিয়া সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা যুক্ত করার পরামর্শ দেন। এ ছাড়া বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে প্রয়োজনে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ কামাল খান রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধান রাখার প্রস্তাব দেন বলে পৃথক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি জুলাই সনদে বিএনপির দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট এবং দলটির নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার বিবেচনায় নিয়ে সংবিধান সংশোধনের কথা বলেন। বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক আবদুল হাই সিদ্দিকও নোট অব ডিসেন্টসহ স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে মত দেন।
সভায় আলোচনার বাইরে কারও লিখিত প্রস্তাব থাকলে তা বিশেষ কমিটির কাছে পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়ার জন্য পরবর্তী বৈঠকগুলোতে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী আরও ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত প্রতিবেদন প্রস্তুতের লক্ষ্য নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।
সভা শেষে বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের অধিকাংশই বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও প্রস্তাব দিয়েছেন। অনেকে লিখিত আকারেও তাঁদের প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এসব প্রস্তাব কমিটি গ্রহণ করে আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করবে।
বিরোধী দলের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সম্পাদকদের অনেকে বিরোধী দলকে বিশেষ কমিটিতে যুক্ত করার জন্য আহ্বান জানানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। কমিটিও এ বিষয়ে একমত। বিরোধী দল কমিটিতে এসে বক্তব্য দিলে তাদের মতামতও বিবেচনা করা হবে। তিনি বলেন, সংসদ অধিবেশন চলাকালেও বিরোধী দলকে কমিটিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাঁরা বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারবেন না, তবে বারবার আহ্বান জানাতে পারেন এবং আশা করতে পারেন যে তারা আলোচনায় অংশ নেবে। সংবিধান সংশোধনের কাজটি ঐক্যবদ্ধভাবে করার লক্ষ্য রয়েছে বলেও তিনি জানান।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও জানান, ডিসেম্বরের মধ্যে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয় সংবিধান সংশোধনী বিল তৈরি করবে। এরপর আগামী বছরের জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিলটি উত্থাপনের আশা করছেন তাঁরা।
গণভোটের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত গণভোটের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই গণভোটের অধ্যাদেশ এখনো আইনে রূপান্তরিত হয়নি। তবে জুলাই সনদ ও গণভোটের বিষয়টি সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান ছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার তা বাদ দিয়েছিল। পরে উচ্চ আদালতের আদেশে ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের বিষয় এসেছে।
তিনি বলেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদসহ নির্দিষ্ট কিছু বিধানে পরিবর্তন আনা হলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে। তবে পুরো সংশোধনী বিলের ওপর গণভোট হবে না; যেসব নির্দিষ্ট সাংবিধানিক বিধানে পরিবর্তন আনা হবে, সেগুলোর ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হবে।
বিশেষ কমিটির সভাপতি আরও বলেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুচ্ছেদ এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে সাংবাদিকেরা বিস্তারিত মতামত দিয়েছেন। বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে এসব মতামত নিয়ে একটি প্রতিবেদন ও পুস্তিকা তৈরি করা হবে। তবে বিশেষ কমিটির মূল প্রতিবেদন পৃথক থাকবে।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদই বিশেষ কমিটির কাজের প্রধান ভিত্তি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় যেসব বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়নি, সেগুলোর পাশাপাশি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারও সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ তৈরির সময় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবারও বিরোধী দলগুলোকে সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের লক্ষ্য হলো বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিয়ে যতটা সম্ভব ঐক্যবদ্ধভাবে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া।![]()