দেশের ব্যাংক খাতের সংস্কার, তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের সুরক্ষা জোরদারে ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প নিচ্ছে সরকার। ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ (এফএসএসপি-২) নামের পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা দেবে। বাকি ১৪ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে আসবে। চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যাংক খাতের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো, ব্যাংক পুনর্গঠন, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কারে সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও নীতিগত সংস্কারেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার বলেন, আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা দূর করতেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক খাতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও ক্রয় কার্যক্রম আধুনিকায়নের পাশাপাশি নীতিগত পর্যায়ে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দুর্বলতায় ভুগছে। কিছু ব্যাংক তারল্য ও মূলধনসংকটেও রয়েছে। পুরোনো তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে ব্যাংক তদারকিতেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। সাইবার হামলা ও আন্তসীমান্ত আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায়ও এসব দুর্বলতা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
এ কারণে প্রকল্পের প্রথম ধাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হবে। প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, প্রযুক্তিসামগ্রী, সফটওয়্যার ও ডেটাবেজ স্থাপনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে পরামর্শক সেবা নেওয়া হবে।
দ্বিতীয় ধাপে আর্থিক খাতের সুরক্ষা জোরদার, ব্যাংক পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কারে সহায়তা দেওয়া হবে। তৃতীয় ধাপে এসব কার্যক্রমের জন্য প্রশাসনিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে।
প্রকল্পে আমানত বিমা তহবিলের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যাংক অবসায়ন বা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, তাঁদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সময় কমানো এবং ব্যাংক পুনর্গঠনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়াতেও প্রকল্পটি ব্যবহার করা হবে। ব্যাংক পুনর্গঠন ও সংস্কারে পারফরম্যান্সভিত্তিক শর্ত ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত কার্যক্রম ও ফলাফলের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
প্রকল্পের ব্যয়ের বড় অংশ প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নে রাখা হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সরঞ্জাম কেনায় ৭১১ কোটি টাকা এবং কম্পিউটার সফটওয়্যার কেনায় ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রশিক্ষণে ৭০ কোটি টাকা, ব্যক্তি পরামর্শক নিয়োগে ২৯ কোটি টাকা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শক সেবায় ৬৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। প্রশিক্ষণের আওতায় ৩ হাজার ৫৬৫ জনকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বাস্তবায়িত ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্টের প্রথম পর্যায় ২০১৫ সালে অনুমোদিত হয়। ওই প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত। প্রাথমিকভাবে এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার; শেষ পর্যন্ত প্রকৃত ব্যয় হয় ২৬২ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। তবে শুধু প্রযুক্তি কিনলেই সমস্যার সমাধান হবে না; কার্যকর ব্যবহারের জন্য দক্ষ জনবলও তৈরি করতে হবে। প্রকল্প গ্রহণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
![]()