ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদ
ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিডল্যান্ড ব্যাংক
ব্যাংকিং এখন আর শুধু শাখা, কাউন্টার আর কাগজের নথির মধ্যে আটকে নেই। গ্রাহকের হাতে থাকা স্মার্টফোনই ক্রমে হয়ে উঠছে ব্যাংকের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। হিসাব খোলা, টাকা স্থানান্তর, বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ কিংবা কিউআর কোডে পেমেন্ট—দৈনন্দিন ব্যাংকিংয়ের বড় একটি অংশ এখন করা যাচ্ছে ঘরে বসেই। প্রযুক্তির এই পরিবর্তনকে সামনে রেখেই দেশের চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে মিডল্যান্ড ব্যাংক।
তবে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদের কাছে ডিজিটাল রূপান্তর মানে শুধু একটি অ্যাপ চালু করা কিংবা কিছু ব্যাংকিং সেবা অনলাইনে নিয়ে আসা নয়। তাঁর ভাবনায় ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন ব্যাংকের সামগ্রিক ব্যবসায়িক মডেলের অংশ। গ্রাহকের অভিজ্ঞতা সহজ করার পাশাপাশি প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, সেবা পৌঁছে দেওয়া, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং ব্যাংকিংকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার জায়গাতেও এর ব্যবহার বাড়াতে চান তিনি।
ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল রূপান্তর এখন শুধু লেনদেন অনলাইনে নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গ্রাহকের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা আরও সহজ, দ্রুত ও সহজলভ্য করার দিকে গুরুত্ব বাড়ছে। মিডল্যান্ড ব্যাংকও এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ডিজিটাল সেবার পরিধি ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারণ করছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যাংকটি ডিজিটাল ব্যাংকিংকে আলাদা কোনো সরবরাহ চ্যানেল হিসেবে দেখছে না। বরং ব্যাংকের সামগ্রিক কার্যক্রমের সঙ্গে এটিকে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। ই-কেওয়াইসি, কাগজবিহীন হিসাব, মিডল্যান্ড অনলাইন, ডিজিটাল ডিপোজিট এবং ডিজিটাল ব্যবস্থায় ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ তারই অংশ।
এর মধ্যে ‘মিডল্যান্ড অনলাইন’ প্ল্যাটফর্মটি গ্রাহকের দৈনন্দিন ব্যাংকিংয়ের বেশ কিছু কাজকে শাখার বাইরে নিয়ে এসেছে। ডিজিটাল উপায়ে বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়ী হিসাব খোলার পাশাপাশি ব্যালেন্স দেখা, আন্তব্যাংক ও মোবাইল ওয়ালেটে অর্থ স্থানান্তর, বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ এবং কিউআরভিত্তিক পেমেন্টের মতো সেবা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর সঙ্গে ই-লোন, ডিভাইস ফাইন্যান্সিং, ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট ও ডিজিটাল কার্ডের মতো সেবাও যুক্ত হয়েছে।
ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদের কাছে এই উদ্যোগগুলোর মূল উদ্দেশ্য একটাই—গ্রাহকের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতাকে সহজ করা। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে গ্রাহক যেন প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সেবা যেকোনো সময়, যেকোনো স্থান থেকে নিতে পারেন।’
শাখার বাইরে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে গ্রাহকের আচরণে পরিবর্তন। একসময় হিসাব খোলা কিংবা একটি সাধারণ লেনদেনের জন্যও ব্যাংকের শাখায় যেতে হতো। এখন প্রযুক্তি সেই নির্ভরতা কমিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে অ্যাপভিত্তিক ব্যাংকিং এবং ই-কেওয়াইসি ব্যবস্থার কারণে হিসাব খোলা ও দৈনন্দিন লেনদেনের বড় একটি অংশ ঘরে বসেই করা সম্ভব হচ্ছে।
ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদ মনে করেন, এর প্রভাব শুধু গ্রাহকের সময় ও খরচ সাশ্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংকগুলোর জন্যও এর মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কমিয়ে আরও বেশি মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে ডিজিটাল ব্যাংকিং একদিকে যেমন গ্রাহকসেবার ধরন বদলাচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাংকের সেবা বিস্তারের পরিসরও বাড়াচ্ছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ঋণ। বিশেষ করে ছোট অঙ্কের ঋণ দ্রুত দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর ঋণ মূল্যায়নের ব্যবহার বাড়ছে। মিডল্যান্ড ব্যাংকও এই জায়গায় কাজ করছে। তবে ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদ মনে করেন, ডিজিটাল ঋণ এখনো বিকাশমান একটি খাত। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি প্রক্রিয়াটিকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে।
মিডল্যান্ড ব্যাংক ডেটানির্ভর ঋণ স্কোরিং এবং ডিজিটাল স্কোরিং ব্যবহার করে দ্রুত ও ছোট অঙ্কের ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। ২০২৫ সালে চালু হওয়া এমডিবি ডিজিটাল ন্যানো লোন, যা বর্তমানে ই-লোন নামে পরিচিত, এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত ডেটা অ্যানালিটিকসের যথাযথ ব্যবহার ঋণ দেওয়ার এই প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
তবে প্রযুক্তির যত বিস্তার, ঝুঁকির জায়গাও তত বিস্তৃত। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো নিরাপত্তা। গ্রাহকের তথ্য, পরিচয় এবং অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ে আস্থা ধরে রাখা কঠিন। এই জায়গাটিকেই বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে মিডল্যান্ড ব্যাংক।
ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদ বলেন, ডিজিটাল ব্যাংকিং যত বাড়ছে, সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্বও তত বাড়ছে। তাঁর মতে, সাইবার নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়। গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, লেনদেন পর্যবেক্ষণ, তথ্য সুরক্ষা এবং গ্রাহক ও কর্মীদের সচেতনতা—সবকিছুর সমন্বয়েই নিরাপদ ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
এই দর্শন থেকেই অথেনটিকেশন, ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড, লেনদেনে তদারকি এবং সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রাহককে নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেন সম্পর্কে সচেতন করাকেও ব্যাংকের দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখছেন তিনি। কারণ প্রযুক্তিগত সুরক্ষা যতই শক্তিশালী হোক, ব্যবহারকারীর সচেতনতা ছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা পূর্ণতা পায় না।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদের ভাবনায় ব্যাংকের মৌলিক ব্যবসার জায়গাটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ঋণ ও সম্পদের মান নিয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট। তাঁর মতে, ব্যাংকিং খাতে ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর চেয়ে ঋণের গুণগত মান ধরে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই মান ধরে রাখার জন্য কোনো একক কৌশল নেই। ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহককে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা, উপযুক্ত ঋণগ্রহীতা নির্বাচন করা এবং ঋণ বিতরণের পর নিয়মিত তদারকি—সবকিছুকেই একসঙ্গে দেখতে হয়। মিডল্যান্ড ব্যাংক ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ, ঋণের উদ্দেশ্য, পরিশোধের সম্ভাবনা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জামানতের মান মূল্যায়ন করে।
ঋণ দেওয়ার পরও প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায় না। কিস্তি পরিশোধের ধারা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির প্রাথমিক লক্ষণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। অর্থাৎ প্রযুক্তি যেখানে ঋণপ্রক্রিয়াকে দ্রুত করতে পারে, সেখানে ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে ব্যাংকিংয়ের প্রচলিত সতর্কতাগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে—এটাই তাঁর বক্তব্যের মূল জায়গা।
গ্রাহকের পরিবর্তিত প্রজন্মের চাহিদাও ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জেন-জি ও তরুণ গ্রাহকদের জন্য ব্যাংকিংকে আরও সহজ, দ্রুত এবং জীবনঘনিষ্ঠ করার পরিকল্পনা রয়েছে মিডল্যান্ড ব্যাংকের। কাগজবিহীন হিসাব, ডিজিটাল ডিপোজিট, মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল ঋণ এবং জীবনঘনিষ্ঠ আর্থিক পণ্যের উন্নয়ন সেই পরিকল্পনার অংশ।
প্রিপেইড কার্ড, কিউআর পেমেন্ট, অ্যাপভিত্তিক সেবা এবং বিভিন্ন গ্রাহক সুবিধার মাধ্যমে তরুণদের ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। তবে শুধু তরুণদের ডিজিটাল সেবায় যুক্ত করাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদ। তাঁদের মধ্যে আর্থিক সচেতনতা এবং সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলাকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তিনি।
কারণ তাঁর কাছে ডিজিটাল ব্যাংকিং কেবল প্রযুক্তির বিষয় নয়; এটি গ্রাহকের আর্থিক আচরণের সঙ্গেও সম্পর্কিত। একজন গ্রাহক যত সহজে ব্যাংকিং সেবা পাবেন, তত বেশি তিনি আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন। সেই জায়গা থেকেই ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সম্পর্কও তৈরি হয়।
আগামী পাঁচ বছরের দিকে তাকিয়ে মিডল্যান্ড ব্যাংক তাই ডিজিটাল রূপান্তরের পরিসর আরও বাড়াতে চায়। ডিজিটাল অনবোর্ডিং থেকে শুরু করে আমানত, লেনদেন, ঋণ, গ্রাহকসেবা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই অটোমেশন ও ডেটা অ্যানালিটিকসের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিকস, স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং ফিনটেক অংশীদারত্বের ব্যবহারও বাড়ানোর কথা বলছেন তিনি। অর্থাৎ আগামী দিনের ব্যাংকিংয়ে প্রযুক্তি কোনো আলাদা বিভাগ হয়ে থাকবে না; বরং ব্যাংকের প্রায় প্রতিটি কার্যক্রমের সঙ্গে প্রযুক্তির সংযোগ আরও গভীর হবে।
তবে প্রযুক্তিনির্ভর এই পরিবর্তনের মাঝেও কিছু বিষয়কে আপসের জায়গায় নিতে চান না ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদ। গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং দায়িত্বশীল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে প্রযুক্তি গ্রহণের সমান গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন তিনি। একই সঙ্গে সুশাসন এবং সম্পদের মান নিয়েও নজর রাখার কথা বলছেন।
মিডল্যান্ড ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এসএমই, খুচরা ব্যাংকিং এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জায়গাটিও গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থাৎ ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারকারী গ্রাহকের সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং ব্যাংকিং সেবার পরিধি আরও বিস্তৃত করা এবং বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের কাছে তা সহজে পৌঁছে দেওয়া।
ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদের বক্তব্যে তাই ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি সমন্বিত ভাবনা পাওয়া যায়। একদিকে দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি, অন্যদিকে ব্যাংকিংয়ের মৌলিক শৃঙ্খলা—ঋণের গুণগত মান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সুশাসন ও গ্রাহকের আস্থা। তাঁর নেতৃত্বে মিডল্যান্ড ব্যাংকের ডিজিটাল যাত্রার পরবর্তী ধাপের চ্যালেঞ্জ হবে এই দুই দিককে একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া।
প্রযুক্তি ব্যাংকিংকে গ্রাহকের আরও কাছে নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু সেই প্রযুক্তির ওপর আস্থা তৈরি হয় নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতার ভিত্তিতে। আর সেই কারণেই ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদের কাছে ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তার প্রশ্নটি আলাদা কোনো বিষয় নয়। বরং ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একই কাঠামোর দুটি অপরিহার্য অংশ।
তিনি এ বিষয়ে বলেন ‘ডিজিটাল রূপান্তরের পাশাপাশি সুশাসন, সাইবার নিরাপত্তা ও সম্পদের মান নিয়ে নজর থাকবে।’
![]()