ছোটবেলায় বাবার অডিও ক্যাসেটের দোকানে গুণী শিল্পীদের আনাগোনা দেখেই সংগীতের প্রতি টান তৈরি হয়েছিল আতিয়া আনিশার। বয়স যখন মাত্র পাঁচ, তখন মা তাকে ভর্তি করিয়ে দেন একটি গানের স্কুলে। সেখান থেকেই শুরু আনুষ্ঠানিক সংগীতশিক্ষা। এরপর প্রতিযোগিতার মঞ্চ, টেলিভিশনের রিয়েলিটি শো, প্লেব্যাক এবং একের পর এক পুরস্কার—দীর্ঘ এই পথচলায় নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেছেন এই সংগীতশিল্পী।
আতিয়া আনিশার সংগীতজীবনের প্রথম উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ২০০৮ সালে। সে বছর চ্যানেল আইয়ের ‘খুদে গানরাজ’ প্রতিযোগিতায় অংশ নেন তিনি। একসময় যে মঞ্চে প্রতিযোগী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন, ১১ বছর পর সেই একই আয়োজনেই গ্রুমার হিসেবে যুক্ত হন তিনি। ২০১৯ সালে ‘খুদে গানরাজ’-এর গ্রুমার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে নিজের ক্যারিয়ারের বিশেষ অর্জন হিসেবে দেখেন আতিয়া।
এর আগে ২০১৭ সালে চ্যানেল আইয়ের ‘সেরাকণ্ঠ’ প্রতিযোগিতায় টপ ফাইনালিস্ট হন তিনি। পরে চ্যানেল আইয়ের শিল্পী হিসেবে যুক্ত হন। পরের বছরই আসে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ। ভারতের জনপ্রিয় সংগীতবিষয়ক রিয়েলিটি শো ‘সা রে গা মা পা’-তে প্রায় চার লাখ প্রতিযোগীর মধ্য থেকে বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত সাতজনের একজন ছিলেন আতিয়া। ভারতের সেই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের লোকগান পরিবেশন করে টপ ২০-এ জায়গা করে নেন তিনি।![]()
‘সা রে গা মা পা’ থেকে ফিরে শুরু হয় আতিয়া আনিশার প্লেব্যাক অধ্যায়। ২০১৮ সালে ‘যদি একদিন’ সিনেমার ‘চুপ কথা’ গানটির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেন তিনি। গানটি প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালে। একই সময়ে ‘শেহেনশাহ’ সিনেমার ‘তুই আমি চল’ গানেও কণ্ঠ দেন তিনি। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছিলেন শাকিব খান। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই অভিনেতার সিনেমায় গান করার সুযোগকে নিজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেন আতিয়া।
এরপর ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সিনেমা, নাটক ও অডিও প্রযোজনায় গান করেছেন তিনি। তবে ২০২২ সাল তার সংগীতজীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। ওই বছর মুক্তি পাওয়া ‘পরাণ’ সিনেমার ‘চলো নিরালায়’ গানটি তার ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করে। গানটি শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকার ও লাইভ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে গানটি নিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি।
‘চলো নিরালায়’ গানটির জন্য ২০২২ সালের মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে দর্শকদের ভোটে জনপ্রিয় বিভাগে সেরা গায়িকার সম্মাননা পান আতিয়া। একই গান তাকে এনে দেয় আনন্দ লাহরি পুরস্কারও। ওই বছর তার আরও কয়েকটি চলচ্চিত্রের গান প্রকাশিত হয়।
তবে ২০২২ সালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি আসে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মাধ্যমে। ‘পায়ের ছাপ’ চলচ্চিত্রের ‘এই শহরের পথে পথে’ গানটির জন্য সেরা নারী গায়িকা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান আতিয়া আনিশা। এটি ছিল তার প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। গানটিতে নারীর শক্তি, প্রত্যয় ও জীবনের তীব্রতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।![]()
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাশাপাশি ২০২২ সালে চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড ও বাংলাদেশ অ্যাচিভার্স অ্যাওয়ার্ডস ইন সিঙ্গিং অ্যান্ড অ্যাক্টিং (BABISAS) অ্যাওয়ার্ডে সেরা নারী গায়িকার স্বীকৃতিও পান আতিয়া। এ ছাড়া ট্রাব অ্যাওয়ার্ড, এজেএফবি স্টার অ্যাওয়ার্ড ও আলোকিত নারী সম্মাননাসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন তিনি।
২০২২ সালেই কঠোর অডিশনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবেও নাম লেখান আতিয়া। সংগীতজীবনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির তালিকায় এটিকেও গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখেন তিনি।
পরবর্তী সময়েও পুরস্কার ও সম্মাননার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আলোকিত নারী সম্মাননা অর্জন করেন তিনি। ২০২৪ সালে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ২২তম ঢালিউড চলচ্চিত্র ও সংগীত পুরস্কারে সেরা গায়িকা হিসেবে সম্মানিত হন। পেশাগত ব্যস্ততার কারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করতে পারেননি তিনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে পাওয়া এই স্বীকৃতিকে নিজের আন্তর্জাতিক সংগীতযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন আতিয়া।
দেশের বাইরে সংগীত পরিবেশনও তার ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ প্রতিযোগিতার গ্র্যান্ড ফিনালের জন্য ব্যাংককে গিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক সফরের অভিজ্ঞতা হয় তার। এরপর ভারতের ‘সা রে গা মা পা’-তে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে আন্তর্জাতিক সংগীত অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেন। পরের বছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় দুই মাসের সংগীত সফরে অংশ নিয়ে ১২টি অঙ্গরাজ্যে গান পরিবেশন করেন তিনি।
আতিয়ার ভাষায়, দেশের বাইরে প্রতিটি সফর তার কাছে শুধু ভ্রমণ নয়; বরং সংগীতের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রোতার কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও সম্মান তার সংগীতজীবনের স্মরণীয় অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি নাটক, অডিও ও ইউটিউব মিলিয়ে আতিয়ার কণ্ঠে প্রকাশিত গানের সংখ্যা এখন শতাধিক। ২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জংলি’ সিনেমার ‘জনম জনম’ গানটিও শ্রোতাদের মধ্যে সাড়া ফেলে। ২০২৬ সালে ‘ডার্ক ওয়ার্ল্ড’ চলচ্চিত্রের ‘ছোট্ট সোনা’ গানটির জন্য চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডে শ্রেষ্ঠ গায়িকার পুরস্কার পান তিনি। একই বছর আলোকিত নারী সম্মাননা এবং বাংলাদেশ-চীন অ্যান্ড টেলি অ্যাওয়ার্ডে সেরা নারী গায়িকার স্বীকৃতিও অর্জন করেন।
২০১৮ সালে প্লেব্যাকের প্রথম রেকর্ডিং থেকে ২০২৬ সালের বিভিন্ন সম্মাননা—এই সময়ের মধ্যে আতিয়া আনিশার সংগীতজীবনে এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। তার নিজের হিসাবে, বর্তমানে তার ঝুলিতে রয়েছে ১৯টি পুরস্কার ও সম্মাননা।
তবে পুরস্কারের সংখ্যার চেয়েও সংগীতের মাধ্যমে শ্রোতাদের ভালোবাসাকেই বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখেন আতিয়া। তার কাছে প্রতিটি সম্মাননা শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং গান শুনে পাশে থাকা মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন।
ছোটবেলায় যে মেয়েটি বাবার ক্যাসেটের দোকানে শিল্পীদের গান শুনে বড় হয়েছেন, কয়েক বছর পর সেই মেয়েই দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে গান গেয়েছেন, চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন। এখন তার লক্ষ্য সংগীতের এই পথচলাকে আরও দীর্ঘ করা এবং দেশের একজন গুণী শিল্পী হিসেবে নিজের জায়গা আরও শক্ত করা।
নিজের অর্জনের কথা প্রকাশ্যে বলার বিষয়েও আতিয়া আনিশার অবস্থান স্পষ্ট। তার মতে, ছোট ছোট স্বপ্ন কঠিন পথ পেরিয়ে যখন বাস্তব হয়, তখন সেই গল্প বলা প্রয়োজন। কারণ একজনের পথচলার গল্প হয়তো অন্য কাউকে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস দিতে পারে।
![]()