মো. সফিউল আজম
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মধুমতি ব্যাংক
দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) ভূমিকা যত বাড়ছে, ব্যাংকগুলোর জন্যও এ খাতের অর্থায়নের ধরন বদলানোর প্রয়োজন তত স্পষ্ট হচ্ছে। শুধু ঋণ বিতরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; উদ্যোক্তার ব্যবসা কতটা টেকসই হচ্ছে, অর্থায়ন কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগছে এবং দীর্ঘমেয়াদে তিনি ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত থাকছেন—এসব বিষয়ও এখন গুরুত্বপূর্ণ। মধুমতি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সফিউল আজমের দৃষ্টিতে এসএমই ব্যাংকিংয়ের মূল জায়গাটিও সেখানেই।
তাঁর মতে, একজন উদ্যোক্তাকে কেবল ঋণগ্রহীতা হিসেবে দেখলে এসএমই খাতের প্রকৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব নয়। বরং ব্যবসার শুরু থেকে বিস্তৃতি পর্যন্ত উদ্যোক্তার প্রয়োজন বুঝে ব্যাংকিং সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে একটি টেকসই ব্যবসায়িক ভিত্তি তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ।
এসএমই খাতে মধুমতি ব্যাংকের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে মো. সফিউল আজম বলেন, ‘মধুমতি ব্যাংকের কাছে এসএমই শুধু একটি ঋণ বিতরণের খাত নয়; আমরা এটিকে দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচনা করি। লক্ষ্য হলো—একজন উদ্যোক্তার প্রয়োজনকে শুধু ঋণ দিয়ে নয়, বরং তাঁর ব্যবসার পুরো যাত্রাপথের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সহায়তা করা।’
তিনি বলেন, প্রান্তিক ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া, দ্রুত ও সহজ প্রক্রিয়ায় অর্থায়ন এবং ব্যবসার প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত অর্থায়ন সমাধান দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে মধুমতি ব্যাংক। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাসহ নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গেও ব্যাংক সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
‘আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি খুব পরিষ্কার—শুধু ঋণগ্রহীতা তৈরি নয়, টেকসই উদ্যোক্তা তৈরি করা,’ বলেন মধুমতি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
এসএমই অর্থায়নের পাশাপাশি ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে মধুমতি ব্যাংক। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে শাখাভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের সীমাবদ্ধতা দূর করতে এজেন্ট ব্যাংকিংকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখছে ব্যাংকটি।
মো. সফিউল আজম বলেন, ‘ব্যাংকিং সেবাবঞ্চিত ও গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূল ধারায় আনাই আমাদের ডিজিটাল বা স্মার্ট এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার মূল লক্ষ্য। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে প্রথাগত শাখা পরিচালনা করা কঠিন, সেখানে আমাদের আধুনিক এজেন্ট বুথগুলো ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিয়েছে।’
এই সেবার মাধ্যমে কৃষিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও প্রবাসী রেমিট্যান্স গ্রহণকারীরা আঙুলের ছাপের মাধ্যমে হিসাব খোলা, আমানত রাখা এবং পরিষেবা বিল পরিশোধের মতো ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছেন বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, এর ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা তৈরি হচ্ছে এবং সঞ্চয়ের প্রবণতাও বাড়ছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদবিহীন লেনদেনের পরিমাণও বাড়ছে।
তবে প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঋণের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। ছোট ঋণের ক্ষেত্রে ব্যবসার প্রকৃত অবস্থা না বুঝে শুধু কাগজপত্রের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিলে ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি।
মো. সফিউল আজম বলেন, ‘এসএমই ঋণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মূল বিষয় হলো—গ্রাহককে ভালোভাবে জানা এবং তাঁর ব্যবসার বাস্তব চিত্র বোঝা। শুধু কাগজপত্র দেখে সিদ্ধান্ত নিলে এসএমই ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি বোঝা সম্ভব নয়।’
এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের ব্যবসার ক্যাশফ্লো, লেনদেনের ধরন, ব্যবসার অভিজ্ঞতা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক আচরণ বিবেচনা করা হয় বলে জানান তিনি। পাশাপাশি ক্রেডিট অ্যাসেসমেন্ট, ঋণ তদারকি এবং আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তাঁর ভাষায়, ‘ছোট ঋণের ক্ষেত্রে আমাদের মূল দর্শন হলো—সঠিক উদ্যোক্তা নির্বাচন, ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকের সঙ্গে নিবিড় ও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা।’ মধুমতি ব্যাংকের এসএমই খাতে খেলাপি ঋণের হার নিয়ন্ত্রিত ও সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওতেও বৈচিত্র্য রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে মধুমতি ব্যাংক। বড় করপোরেট ঋণের পাশাপাশি এসএমই ও খুচরা ঋণের মধ্যে ভারসাম্য রাখাকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় মনে করেন মো. সফিউল আজম।
তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, বড় করপোরেট, এসএমই ও খুচরা ঋণ—প্রতিটি খাতের নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। তাই ভারসাম্যপূর্ণ ঋণ পোর্টফোলিও ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন।’ তাঁর মতে, ঋণ পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য থাকলে ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হয়।
এসএমই খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নারী উদ্যোক্তা। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও অর্থায়ন, জামানত এবং আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশের ক্ষেত্রে এখনো বিভিন্ন বাস্তব বাধা রয়েছে। এসব বাধা কমাতে প্রয়োজনভিত্তিক অর্থায়নের পাশাপাশি ব্যাংকিং প্রক্রিয়াকেও সহজ করার ওপর জোর দিচ্ছে মধুমতি ব্যাংক।
মো. সফিউল আজম বলেন, ‘নারী স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। নারী উদ্যোক্তারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। কিন্তু অর্থায়ন, জামানত ও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশের ক্ষেত্রে তাঁদের এখনো কিছু বাস্তব বাধা রয়েছে।’
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষায়িত ঋণ স্কিম চালু রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এসব ঋণ তুলনামূলক সাশ্রয়ী সুদে এবং সহজ শর্তে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধুমতি ব্যাংকের ‘মধুমতি বন্ধন’ অ্যাপভিত্তিক ডিজিটাল অনবোর্ডিং প্ল্যাটফর্ম।
এর ফলে নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং সেবা নিতে শাখায় গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার প্রয়োজন কমেছে। ই-কেওয়াইসি ব্যবস্থার মাধ্যমে ঘরে বসেই ডিজিটাল উপায়ে হিসাব খোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি উদ্যোক্তারা নিজেদের ব্যবসায় আরও বেশি সময় দিতে পারছেন বলে মনে করেন তিনি।
‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে একজন নারী উদ্যোক্তার জন্য ব্যাংকের দরজা শুধু খোলা রাখা নয়, সেই দরজা দিয়ে প্রবেশের প্রক্রিয়াটিও সহজ করা,’ বলেন মো. সফিউল আজম।
আগামী দিনের এসএমই ব্যাংকিং নিয়ে তাঁর পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে প্রযুক্তি, তথ্য-উপাত্ত এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সেবা। উদ্যোক্তাদের ঋণ পেতে অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে না—এমন একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় মধুমতি ব্যাংক।
মো. সফিউল আজম বলেন, ‘আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য হচ্ছে এসএমই ব্যাংকিংকে আরও সহজ, দ্রুত, তথ্য-উপাত্তনির্ভর ও গ্রাহককেন্দ্রিক করা। আমরা চাই একজন উদ্যোক্তাকে ঋণের জন্য অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।’
তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে ব্যাংকের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি। তাঁর মতে, ভবিষ্যতের এসএমই ব্যাংকিংয়ে উদ্যোক্তাকে শুধু ব্যাংকের কাছে এসে সেবা নেওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হবে না; প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাংককেই উদ্যোক্তার প্রয়োজন আগেভাগে বুঝতে হবে।
এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে প্রান্তিক ব্যবসার ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং সহজ করতে ফিনটেক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে মধুমতি ব্যাংকের।
মো. সফিউল আজমের দৃষ্টিতে, এসএমই ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ শুধু ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উদ্যোক্তার ব্যবসা বোঝা, প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়ন করা, প্রযুক্তির মাধ্যমে সেবা সহজ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসাটিকে টেকসই করার সক্ষমতা তৈরি—এই সমন্বিত ব্যবস্থাই এসএমই ব্যাংকিংকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।![]()