ড. মেলিতা মেহজাবিন
অধ্যাপক, আইবিএ, ঢাবি চেয়ারম্যান, ন্যাশনাল ব্যাংক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) অধ্যাপক ড. মেলিতা মেহজাবিনের পেশাগত পরিসর একদিকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা, অন্যদিকে ব্যাংকিং ও করপোরেট ব্যবস্থাপনা। ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি করপোরেট সুশাসন, আর্থিক জবাবদিহি, টেকসই অর্থায়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং শিল্পের পরিবেশগত রূপান্তর নিয়ে কাজ করছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকের ভূমিকা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের গুরুত্ব নিয়ে তাঁর গবেষণা ও প্রকাশিত বক্তব্যে এসব বিষয়ই ঘুরেফিরে এসেছে।
ড. মেলিতা মেহজাবিনের শিক্ষাজীবনের শুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে। এখান থেকে ২০০৪ সালে বিবিএ এবং ২০০৮ সালে এমবিএ সম্পন্ন করেন তিনি। পরে শ্রীলঙ্কার কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন অধ্যয়নে উচ্চশিক্ষা নেন। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের অ্যালায়েন্স ম্যানচেস্টার বিজনেস স্কুল থেকে ২০১৭ সালে হিসাববিজ্ঞান ও অর্থায়নে পিএইচডি অর্জন করেন। তিনি কমনওয়েলথ স্কলার ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করার আগে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ ও সিটিব্যাংক এনএতে পাঁচ বছর কাজ করেছেন। ২০০৯ সালে আইবিএতে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর শিক্ষকতা, গবেষণা ও করপোরেট পরামর্শের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও যুক্ত হন তিনি।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ঋণের যথাযথ মূল্যায়ন, খেলাপি ঋণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি এবং পরিচালনা পর্ষদের কার্যকারিতা। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কেবল নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদনকারী একটি কাঠামো নয়; ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও এর দায়িত্ব। এই জায়গায় ড. মেলিতা মেহজাবিনের গবেষণার বিষয়গুলো তাঁর ব্যাংকিং খাতের দায়িত্বের সঙ্গে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দেশের প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি ন্যাশনাল ব্যাংক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, তারল্য ও আমানতকারীদের আস্থা নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ফলে তাঁর দায়িত্বের একটি বড় অংশ হলো ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম, সুশাসন ও আর্থিক সক্ষমতা শক্তিশালী করার প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেওয়া।
ব্যাংকিংয়ের বাইরেও টেকসই অর্থায়ন নিয়ে তাঁর বক্তব্য উল্লেখযোগ্য। ২০২৬ সালের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স সামিটে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুরো বেসরকারি খাতের কেন্দ্রীয় অংশ। তারা চাইলে টেকসই ব্যবসায়িক চর্চাকে অনেক বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে পারে।” বক্তব্যটির ব্যাখ্যায় তিনি তুলে ধরেন, ব্যাংকগুলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যে অর্থায়ন করে, তার মাধ্যমে পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসনের মানদণ্ড অনুসরণকারী ব্যবসার প্রসার ঘটানো সম্ভব।
পোশাকশিল্পে বৃত্তাকার অর্থনীতি নিয়ে ড. মেলিতা মেহজাবিনের গবেষণা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২–২০২৭ মেয়াদের একটি গবেষণা প্রকল্পে তিনি বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে বৃত্তাকার অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন। প্রকল্পটি ডেনিশ ফেলোশিপ সেন্টারের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। বৃত্তাকার অর্থনীতির মূল ধারণা হলো কাঁচামালের অপচয় কমানো, ব্যবহৃত উপকরণ পুনর্ব্যবহার এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের আনুষ্ঠানিকীকরণ নিয়েও তাঁর গবেষণা রয়েছে। ২০২৪ সালে Business Strategy and Development সাময়িকীতে প্রকাশিত ড. মেলিতা মেহজাবিন ও সাদিয়া নূর খানের যৌথ গবেষণায় বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো আনুষ্ঠানিক ব্যবসায় রূপান্তরিত হওয়ার পেছনে কী ধরনের প্রণোদনা ও বাধা কাজ করে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার নিয়মিত লেনদেন ও বিক্রির তথ্য থাকলে ব্যাংকের পক্ষে তাঁর ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা মূল্যায়ন করা সহজ হয়। অন্যদিকে উদ্যোক্তাও ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন যন্ত্রপাতি কেনা এবং বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের জন্য অর্থায়ন পেতে পারেন। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোগকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে যুক্ত করা শুধু নিবন্ধন বা কর আহরণের প্রশ্ন নয়; এটি উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বাড়ানোরও একটি উপায়।
প্রবাসী আয় নিয়েও ড. মেলিতা মেহজাবিনের বক্তব্যে অর্থনীতির মানবিক দিকটি উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে ন্যাশনাল ব্যাংকের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “যাঁরা মাত্র এক ডলারও দেশে পাঠান, তাঁরাও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।” বক্তব্যটির মাধ্যমে তিনি প্রবাসী আয়ের অবদানকে শুধু বড় অঙ্কের রেমিট্যান্স পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি প্রবাসীর অবদান হিসেবে দেখার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
করপোরেট নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে তাঁর বক্তব্যও আলোচনার দাবি রাখে। ২০২৫ সালে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এ প্রকাশিত এক মতামতধর্মী লেখায় তিনি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে নারী স্বাধীন পরিচালকের অংশগ্রহণ বাড়ানো নিয়ে লিখেছেন। সেখানে তাঁর বক্তব্য, “এটি শুধু লিঙ্গের প্রশ্ন নয়; এটি করপোরেট সুশাসন ও নেতৃত্ব তৈরির সক্ষমতারও প্রশ্ন।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, স্বাধীন পরিচালকদের কেবল নিয়োগ দিলেই হয় না; তাঁদের আর্থিক তথ্য বোঝা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা এবং স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সক্ষমতাও থাকতে হবে।
ড. মেলিতা মেহজাবিনের কর্মপরিসরে তাই একদিকে গবেষণার মাধ্যমে এসব সমস্যার প্রাতিষ্ঠানিক দিক বিশ্লেষণ, অন্যদিকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থেকে আর্থিক খাতের বাস্তব সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ রয়েছে। তবে গবেষণায় পাওয়া ধারণা কতটা বাস্তব নীতিতে প্রতিফলিত হয় এবং ব্যাংকের নেতৃত্বে তা কতটা কার্যকর ফল দেয়, সেটিই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়ানো নয়, সেই প্রবৃদ্ধির ভিত্তিকে শক্তিশালী করার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ব্যাংকিং খাতের আস্থা, উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, শিল্পের উৎপাদনশীলতা এবং করপোরেট জবাবদিহির উন্নয়ন—এসব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি ও পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন প্রয়োজন। ড. মেলিতা মেহজাবিনের গবেষণা, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং প্রকাশিত বক্তব্য এই আলোচনার জন্য একটি প্রাসঙ্গিক ভিত্তি তৈরি করেছে। তাঁর দায়িত্ব ও গবেষণার গুরুত্ব শেষ পর্যন্ত প্রতিফলিত হবে সেই জ্ঞান কীভাবে বাস্তব সিদ্ধান্তে কাজে লাগে এবং অর্থনীতিতে কতটা দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে, তার মধ্য দিয়ে।
![]()