আশা ভোঁসলের জন্য সামান্য নিবেদন
ফারুক মঈন উদ্দিন
মুম্বাইর হাজী আলীর দরগার দিক থেকে ভুলাভাই দেশাই রোড হয়ে পেডার রোড (বর্তমানে গোপালরাও দেশমুখ মার্গ) ধরে জসলোক হাসপাতালের দিকে এগিয়ে গেলে হাতের বামে কারমাইকেল রোডে ঢোকার ঠিক মোড়ের ওপর বড় অ্যাপার্টমেন্ট বাড়িটার নাম “প্রভুকুঞ্জ।” দক্ষিণ মুম্বাইর সমুদ্রের খাঁড়ির ঠিক লাগোয়া মেকার্স টাওয়ারের আটতলা থেকে দুদিকের জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখা যাওয়া আলো হাওয়া খেলা করা বাড়িটা ছেড়ে এসে এই প্রভুকুঞ্জের তিনপাশ বদ্ধ বাড়িটিতে খুব দমবন্ধ লাগতো। এবাড়িতে একমাত্র সান্ত্বনা ছিল যে সে বাড়ির বিভিন্ন ফ্ল্যাটে থাকতেন লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোঁশলে এবং তাঁদের অন্য ভাই বোনেরা। একই বাড়ির বাসিন্দা হিসেবে মাঝে মাঝে কখনো দেখা মিলত লতাজীর সঙ্গে। তবে তাঁর নিরাপত্তা রক্ষীদের কারণে তাঁর সঙ্গে একই লিফটে ওঠার সুযোগ ছিল না অন্য কারো। আশা ভোঁশলের ব্যাপারে অবশ্য এমন কোনো বিধিনিষেধ ছিল না এবং তিনিও হুটহাট করে যখন তখন ওপর-নিচ ওঠানামা করতেন বলে তাঁর সাথে বহুবার লিফটে দেখা হয়েছে। তাঁর তারকা অবস্থানের কারণে নিজে থেকে কোনো কথা না বললেও প্রতিবেশী হিসেবে তিনিই আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করতেন ‘ক্যায়সে হ্যায়?’ সেবাড়ির পূর্বপাশে একমাত্র বারান্দাটিতে বসে মাঝে মাঝে তাঁর গাওয়া রবীন্দ্র সংগীতের ক্যাসেট বাজাতাম উঁচু ভলিউমে, যাতে তিনি শুনতে পান এবং বুঝতে পারেন যে এবাড়িতে তাঁর গাওয়া রবীন্দ্র সংগীতের শ্রোতা আছে। কুশলবার্তা জানতে চাওয়ার সৌজন্য একারণেই দেখাতেন কি না, সেটি নিশ্চিত করে বলা যায় না।
মুম্বাইর ট্রাফিক সমস্যা মেটানোর জন্য ২০০০ সালে রাজ্য সরকার চৌপাটি থেকে হাজী আলী পর্যন্ত পেডার রোডের ওপর দিয়ে প্রায় ৪ কিলোমিটার লম্বা এক ফ্লাইওভার তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল, যেটি ‘প্রভুকুঞ্জ’সহ অন্যান্য ভবনের ঠিক পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে যাওয়ার কথা। প্রস্তাবিত এই ফ্লাইওভারের বিরুদ্ধে দেন-দরবার শুরু করেছিল পেডার রোডের অধিবাসীরা। তাঁরা লতা-আশা ভগ্নিদ্বয়কেও সম্পৃক্ত করেছিলেন এই দরবারে। তখন মহারাষ্ট্রের মূখ্যমন্ত্রী ছিলেন বিলাসরাও দেশমুখ (বলিউডের অভিনেতা রীতেশ দেশমুখের বাবা)। পেডার রোডের বাসিন্দাদের নিয়ে এই দুই শিল্পী মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে জানান, এই ফ্লাইওভার পেডার রোড এলাকায় শব্দদূষণ বৃদ্ধি করবে। কোনো রকম রাখঢাক না করেই তাঁরা বলেছেন, ফ্লাইওভারটা তাঁদের ঘরের জানালার খুব কাছ দিয়ে যাবে বলে তাঁদের অসুবিধা হবে এবং নিরাপত্তা ক্ষুন্ন হবে। এ পর্যায়ে আশা ভোঁসলে আরও একটু স্পর্শকাতর বিষয়ে হাত দিয়ে বলেছিলেন, ‘হামারি আওয়াজ চলি যায়েগি।’ এমনকি দুবাইতে গিয়ে সেটল করবেন, এমন হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি। লতা-আশা ভগ্নিদ্বয়ের বিরোধিতা কিংবা অন্য যে কোনো কারণেই হোক, ফ্লাইওভারটি আর হয়নি।
আশা ভোঁসলের প্রথম স্বামী গণপতরাও ভোঁসলে ছিলেন লতা মুঙ্গেশকরের সেক্রেটারি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিশ বছরের বড় গণপতরাওয়ের সঙ্গে প্রেম করে ঘর বেঁধেছিলেন আশা । তাঁর পরিবার এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। বিশেষ করে তাঁর দিদি লতা মুঙ্গেশকর এই সম্পর্কের বিরোধিতা করেছিলেন সবচাইতে বেশি। এই বিয়ের কারণে দিদির সঙ্গে মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয় ছোট বোনের। আশা ভোঁসলের শ্বশুরবাড়ির রক্ষণশীল লোকজনও একজন গায়িকাকে বাড়ির বউ হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। অন্যদিকে স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কও খারাপ হয়ে যায় তাঁর। একটা সময় পর স্ত্রী আশাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছিলেন গণপত। দাম্পত্য জীবনে প্রায় রোজই তাঁর উপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালাতেন গণপতরাও। এমনকী অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় একবার ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন আশা। তাঁদের সংসার ভেঙে গেলে গণপতরাও যাঁকে বিয়ে করেন, তাঁর নামও ছিল আশাবাই। প্রথম বিয়ে ভাঙার পর তিনি বিয়ে করেছিলেন সুরকার আর ডি বর্মণকে । তবে এই বিয়েটাও সুখের হয়নি তাঁর। শোনা যায়, রাহুল দেব বর্মনের মদ্যপান এবং অতিরিক্ত ধূমপান সহ্য করতে পারতেন না আশা। সেই কারণেই নাকি আলাদা থাকতে শুরু করেন তাঁরা। বিয়ে না ভাঙলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে আলাদা থাকতেন তাঁরা।
ভারতীয় ক্রিকেটার রাজ সিং দুঙ্গারপুরের সঙ্গে প্রেমটা পরিণয়ে পরিণত না হওয়ায় তাঁর বড়বোন লতা মুঙ্গেশকরতো সারা জীবন কুমারীই থেকে গিয়েছিলেন । রাজ সিং ছিলেন তৎকালীন রাজপুতানার ভূতপূর্ব রাজা মহারাওয়াল লক্ষ্মণ সিংয়ের ছোট ছেলে। লতা মুঙ্গেশকরকে বিয়ে করার কথা শুনে আঁতকে উঠেছিলেন রাজা। সাধারণ পরিবারের মেয়ে লতাকে ঘরের বউ করতে রাজি ছিলেন না রাজপরিবারের কেউ। কিন্তু, রাজপুত্র গোঁ ধরে বসেন যে লতা মুঙ্গেশকরকে বিয়ে না করলে সারাজীবন কুমারই থেকে যাবেন তিনি। অন্যদিকে, লতার পরিবারও চেয়েছিল তাদের মেয়ের জন্য একজন মারাঠি পাত্র। তাই বিয়ে না করেও একে অপরের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা দুজনেই । লতাও মনে মনে রাজকেই নাকি স্বামী হিসেবে মানতেন। কেউ কেউ বলেন, তাঁরা নাকি গোপনে বিয়েও করেছিলেন।
আমি মুম্বাইর সিসিআই ক্লাবের (ক্রিকেট ক্লাব অভ ইন্ডিয়া) মেম্বারশিপ যখন পাই, তখন ক্লাবটির চেয়ারম্যান ছিলেন রাজ সিং দুঙ্গারপুর। আমার প্রপোজার ছিলেন রাজ সিংয়ের বন্ধু। সাক্ষাৎকার পর্বে প্রপোজার এবং ক্যান্ডিডেটের স্যুট-টাই পরা বাধ্যতামূলক। আমার প্রপোজার বাড়ি থেকে টাই নিয়ে আসেননি। তাই অগত্যা ক্লাবে পৌঁছে চেয়ারম্যানের একটা টাই পরে নিয়েছিলেন তিনি। সাক্ষাৎকার শেষ হয়ে গেলে আমরা যখন বের হয়ে আসছিলাম, তখন রাজ সিং বন্ধুটির দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলেছিলেন, খুব সুন্দর একটা টাই পরেছো তুমি।
আশা ভোঁসলের মৃত্যুতে তাঁর কথা বলতে গিয়ে ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে গেল।