যেমন জনগণ, তেমন তার সুপারস্টার, তেমন মিডিয়া
মোজাফ্ফর হোসেন এর ফেসবুক পে’জ থেকে
আমাদের চলচ্চিত্র ও বিনোদন জগত একটা সার্কাসের জায়গা। যে কাজ করেন, সেই কাজকেই ওউন করেন না। যে কাজ (অভিনয়) করে তারকাখ্যাতি পান, আয়রোজগার করেন, সেই কাজের প্রতিই তাদের চরম অসম্মান। অর্থাৎ অভিনয় কররেও, গান গাইলেও কেউ আর্টিস্ট না।
দেখবেন, যখন আর কাজ পাবে না, তখন নায়িকারা হজ করে বোরকা ধরেন। কোনো নায়ক মারা গেলে তার অভিনয়ের মূল্যায়নের চেয়ে সে যে শুটিং থামিয়ে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত, সেটা ফলাও করো প্রচার করে। বাংলা সিনেমায় ধর্ষকের চরিত্রে অভিনয় করে ‘সুখ্যাত’ ভিলেনও কথায় কথায় যেভাবে আলহামদুলিল্লাহ, সুবহানআল্লাহ বলেন, হুজুরও ফেল মেরে যাবে।
এফডিসির নির্বাচনী প্রচারণায় প্রার্থী নায়ক এফডিসিতে মসজিদ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চান। নায়ক অমর সানী ভক্তদের সিনেমা দেখার পাশাপাশি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সংগীতশিল্পী পুরস্কার নিতে গিয়ে বলছেন, রোজা রেখে আমি গানটি করেছি, সকল প্রশংসা তাই আল্লাহর। সিনেমার নায়িকা তার আয় দিয়ে আধুনিক স্টাইলে মসজিদ বানিয়ে দিচ্ছেন।
একজন পরিচালক কিছুদিন আগে আবেগে কাঁদতে কাঁদতে তার সিনেমাকে ‘পাপমুক্ত সিনেমা’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন, সেখান নায়িকার হাত কেউ ধরেনি উল্লেখ করে। তার সিনেমা দেখে নাকি ওজু ভাঙবে না।
হেলেনা জাহাঙ্গীর একবার সিনেমা দেখে এসে বলেছিলেন, এই সিনেমা ওজু করে দেখা যাবে। ওজু করে সিনেমা দেখা যাবে, এইটা কোনো সিনেমার যোগ্যতা হতে পারে না, অর্থাৎ শিল্পের মানদণ্ডও ধর্ম দিয়ে নির্ধারণ করে দেওয়ার প্রবণতাও শুরু হয়েছে। কাজেই অনন্ত জলিলদের মতো ব্যবসায়ীদের জন্ম হতে দেখি, যারা সিনেমার সঙ্গে ধর্মকে মিশিয়ে ‘শরিয়তী’ বিনোদন ব্যবস্থা তৈরি করতে চাচ্ছেন।
ঢাকাই চলচ্চিত্রের নবাগত নায়িকা এক নায়িকা সিনেমা মুক্তির আগে পবিত্র পবিত্র হজটা সেরে আসলেন। শুটিং শেষ করে সহি সালামতে ওমরাহ পালনের জন্য দোয়া নিয়ে হজে গেলেন মাহিয়া মাহী। হজ থেকে ফিরে নিজের রেস্টুরেন্টে দাঁড়িয়ে থেকে ইফতারি বিক্রি করছেন তিনি। রেস্টুরেন্টের নাম কি জানেন? ‘ফারিশতা!’
চিত্রনায়িকা মৌসুমী বলেছিলেন, “আমি মারা যাবার পর, আমার লাশ যেন কাউকে দেখতে দেওয়া না হয়। জানাজা হবে, কিন্তু আমি চাই না কেউ আমাকে আর দেখুক। দর্শকের কাছে আমার অনেক ছবি রয়ে গেছে, সেগুলো আপনারা যার যার মোবাইল থেকে ডিলিট করে দেবেন। মারা যাওয়ার আগে বড় হজ করার ইচ্ছে রয়েছে।”
কোনো অসুবিধা নাই। তা তিনি বলতেই পারেন। কিন্তু এগুলো বলার দু বছর পর আবার সিনেমা করলেন!!
ওয়ারফেজের লিড ভোকালিস্ট পলাশ নূর সমকালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন: “আমি একজন ধার্মিক মানুষ। ধর্ম এবং সংগীত সাংঘর্ষিক। আল্লাহ জানেন কাকে ক্ষমা করবেন। আমি প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে তাঁর কাছে ক্ষমা চাই।” মসজিদে আজান দিয়ে শেষ জীবন পার করতে চান বলে জানান পলাশ নূর! তিনিই আবার এসব বলার কদিন পর কোক স্টুডিওতে গান করেন। শুনলাম কনসার্ট করে বেড়াচ্ছেন। তিনি এও বলেছিলেন, ‘আমি গান করি অন্যের জন্য। আর কুরান তিলাওয়াত করি আল্লাহর জন্য। তাই এই দুটোকে কখনো এক করা যাবে না।’ তার মানে দুটো আলাদা করেও করা যায়?? যদি সেটা হয়, তাহলে তিনি গান গাওয়ার জন্য প্রতি রাতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান কেন? ক্ষমা চেয়ে আবার গানই-বা কেন?? এই হলো ভণ্ডামির নমুনা।
আলী হাসান নামের এক র্যাপার বলেছিলেন, “গান বাজনার টাকা হারাম। আমার অটো বিজনেসের টাকা হালাল। সংগীত থেকে আয় হারাম। তাই বিজনেসের টাকায় (হালাল আয়ে) বাজার সদাই করি, আর মিডিয়ার টাকায় (হারাম আয়ে) বিল্ডিং খিচি (বাড়ি করি)। মিলাই ঝুলাই করতেছি!”
বোঝেন অবস্থা!!!
এই বিনোদনকর্মীরা আচরণে মৌলানা, কিন্তু জীবিকা সিনেমা/মিডিয়া। তাতে ইসলামধর্মের উন্নতি কতোটা হচ্ছে জানি না, তবে শিল্পের যে বিরাট ক্ষতি হচ্ছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেয়। সারাজীবন সিনেমা করে অবসরে যাওয়ার পর প্রমাণ করছেন, সিনেমা মুসলমানদের জন্য না। তারা তো তাদের হিসেবে পার পেয়ে গেলেন, এপার-ওপার দুটোতেই। কিন্তু নতুন যে মেয়েগুলো আসবে, তাদের জন্য কি বার্তা দিয়ে গেলেন? মুসলমানদের জন্য সিনেমা না; এই তো? অথবা সিনেমা করতে হলে অনন্ত জলিল-ওমর সানীদের মতো করতে হবে—সকালে শুটিং বিকালে ওয়াজ।
সিনেসার শিল্পীরা আধুনিক অভিনয়প্রশিক্ষণ সেন্টার খুলবে, নানা ধরনের আর্ট একাডেমি খুলবে, কিন্তু তাদের প্রতিশ্রুতি লক্ষ করেন।
এদেশের মুসলমানরাও তেমন, সিনেমা করা লোকজনকেও ইসলাম প্রচারকের ভূমিকায় দেখতে চান! এফডিসি আর ইসলামি ফাউন্ডেশন গুলিয়ে ফেলেন!
শেষ কথা হলো, যেমন জনগণ, তেমন তার সুপারস্টার, তেমন মিডিয়া।
মোজাফ্ফর হোসেন এর ফেসবুক পে’জ থেকে ।