বাংলা কিউআরের বিস্তারে বদলে যেতে পারে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা
ড. শাহাদাত খান
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), টালিখাতা ও টালিপে
বাংলাদেশে গত দেড় দশকে ডিজিটাল আর্থিক সেবায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও খুচরা লেনদেনে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা এখনো কাটেনি বলে মন্তব্য করেছেন টালিখাতা ও টালিপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. শাহাদাত খান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে বাংলা কিউআর ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়ন হলে দেশের পেমেন্ট ব্যবস্থা নতুন এক
পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
ড. শাহাদাত খান বলেন, বর্তমানে দেশে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) ৯ কোটির বেশি সক্রিয় হিসাব রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ২ কোটির বেশি লেনদেনের মাধ্যমে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা আদান-প্রদান হয়। মানুষ নিয়মিত ক্যাশ ইন-আউট, অর্থ প্রেরণ, বেতন-ভাতা গ্রহণ, বিল পরিশোধ ও মোবাইল রিচার্জ করলেও খুচরা কেনাকাটায় ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার এখনো সীমিত।
তার ভাষ্য, দেশের খুচরা লেনদেনের ৯৮ শতাংশেরও বেশি এখনো নগদ অর্থে সম্পন্ন হয়। ফলে ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ প্রবেশ করলেও কেনাকাটার আগে তা আবার নগদে উত্তোলন করা হয়। এতে গ্রাহককে ক্যাশ আউট চার্জ দিতে হয়, আবার ব্যবসায়ীকেও দিন শেষে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার ঝামেলা পোহাতে হয়।
তিনি বলেন, এই বাস্তবতা পরিবর্তনে বাংলাদেশ ব্যাংক সমন্বিত বাংলা কিউআর চালু করেছে, যার মাধ্যমে যে কোনো ব্যাংক বা ডিজিটাল ওয়ালেটের গ্রাহক একই কিউআর কোড স্ক্যান করে যে কোনো মার্চেন্টকে অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন।
এ উদ্যোগ সফল করতে তিনি এপি-সি (এপিসি) স্ট্র্যাটেজি ফ্রেমওয়ার্ক অনুসরণের পরামর্শ দেন। এতে পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে— প্রেজেন্স, পারফরম্যান্স, প্রমোশন, প্রাইসিং ও কমিউনিকেশন।
তার মতে, প্রথমে বাংলা কিউআরের বিস্তৃত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি ব্যাংক ও ওয়ালেট অ্যাপের হোমস্ক্রিনে সহজে কিউআর স্ক্যানের সুবিধা থাকতে হবে। একই সঙ্গে লেনদেনের গতি ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো সমস্যা হলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সমাধান পাওয়া যায়।
ড. শাহাদাত খান জানান, প্রেজেন্সের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। গত জুন থেকে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত মান অনুযায়ী বাংলা কিউআর সরবরাহ করছে এবং নিজস্ব কিউআর কোড তুলে নিচ্ছে। বর্তমানে দেশে ১৫ লাখের বেশি বাংলা কিউআর মার্চেন্ট রয়েছে। এছাড়া ১ জুলাই থেকে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করায় এই সংখ্যা আরও বাড়বে। বিকাশ, নগদসহ প্রধান ওয়ালেট ও ব্যাংকিং অ্যাপগুলোতেও বাংলা কিউআর পেমেন্ট সুবিধা যুক্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে পারফরম্যান্সে। তার প্রস্তাব, প্রতি এক হাজারটি লেনদেনের মধ্যে অন্তত ৯৭০টি সফল হতে হবে। ব্যর্থতার হার ৩ শতাংশের বেশি হলে ব্যবহারকারীর আস্থা নষ্ট হবে। কোনো কারণে হিসাব থেকে টাকা কেটে গেলেও পেমেন্ট ব্যর্থ হলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই অর্থ ফেরত নিশ্চিত করতে হবে, যাতে গ্রাহককে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে না হয়।
প্রমোশন ও প্রাইসিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, অবকাঠামো স্থিতিশীল হওয়ার পর ব্যবহারকারীদের মধ্যে অভ্যাস গড়ে তুলতে প্রচারণা ও প্রণোদনা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে ৫০০ টাকা বা তার কম মূল্যের লেনদেনের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এক বছরের জন্য সার্ভিস চার্জ মওকুফ করতে পারে। এতে ছোট ব্যবসায়ীরা ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে উৎসাহিত হবেন এবং গ্রাহকরাও ছোট অঙ্কের কেনাকাটায় কিউআর ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) ১ শতাংশ হলেও অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর লাভের তুলনায় এটি বেশি। তাই ধাপে ধাপে এটি ০ দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি নামিয়ে আনার সুপারিশ করেন তিনি।
সচেতনতার ওপরও গুরুত্ব দিয়ে ড. শাহাদাত খান বলেন, শুধু প্রযুক্তি চালু করলেই হবে না। সাধারণ মানুষকে জানতে হবে কোথায় বাংলা কিউআর ব্যবহার করা যায়, এটি কতটা নিরাপদ এবং কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদেরও ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের ব্যবসায়িক সুবিধা সম্পর্কে নিয়মিত অবহিত করতে হবে।
তার মতে, প্রেজেন্স ও পারফরম্যান্সকে অগ্রাধিকার দিয়ে, এরপর প্রমোশন ও প্রাইসিং এবং সব সময় কমিউনিকেশনকে সঙ্গে রেখে এপিসি ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের পেমেন্ট ব্যবস্থা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। এর ফলে ডিজিটাল লেনদেন বাড়বে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার হবে, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ত্বরান্বিত হবে।