নদীভাঙনে ভারতের ওপারে চলে গেছে জমি, চোখের সামনে অন্যের চাষ দেখছেন জুড়ীর কৃষকরা
‘জমির মালিক আমরা। কাগজপত্রও আমাদের নামে। কিন্তু সেই জমিতে এখন চাষ করছেন ভারতের লোকজন। আমরা শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি, কিছুই করতে পারি না।’
কথাগুলো বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার সাগরনাল ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বরইতলী গ্রামের কৃষকেরা। দীর্ঘদিনের নদীভাঙনে তাদের পৈতৃক কৃষিজমি জুড়ী নদীর ওপারে চলে গেছে। সরকারি খতিয়ানে জমির মালিকানা তাদের থাকলেও সীমান্ত-সংক্রান্ত বাস্তবতায় সেই জমিতে প্রবেশ বা চাষাবাদ করার সুযোগ নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভারত থেকে নেমে আসা জুড়ী নদী বরইতলী গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক দশক আগে নদীর মূল প্রবাহ ছিল ভারতের অভ্যন্তরের দিকে। তবে গত প্রায় ৫০ বছরে নদীটি ধারাবাহিক ভাঙনের মাধ্যমে বাংলাদেশের দিকে সরে এসেছে। এতে একের পর এক কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পরে নদীর ওপারে জেগে ওঠা চর এখন ভারতের বাসিন্দারা চাষাবাদের কাজে ব্যবহার করছেন।
স্থানীয় কৃষক আব্দুস শুকুর, ইয়াকুব আলী ও জিল্লুর রহমান জানান, তাদের পূর্বপুরুষরা এসব জমিতে ধান, শাকসবজি ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসল আবাদ করতেন। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ একর জমি কার্যত ভারতের অংশে চলে গেছে। কাগজে-কলমে জমির মালিকানা বাংলাদেশি কৃষকদের হলেও সীমান্ত আইন ও বাস্তব পরিস্থিতির কারণে সেখানে গিয়ে জমি চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না।
কৃষক আব্দুল আহাদ বলেন, নদীভাঙনে শুধু কৃষিজমিই নয়, কয়েকটি বসতভিটাও বিলীন হয়েছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে অন্যত্র চলে গেছে। বর্তমানে নদীতীরে ২৫ থেকে ৩০টি পরিবার বসবাস করছে, যার মধ্যে চার থেকে পাঁচটি পরিবার এখনো ভাঙনের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, নদীভাঙনে তাদের চলাচলের একমাত্র সড়কের বড় অংশও নদীগর্ভে চলে গেছে। এই পথ ব্যবহার করেন বরইতলী ও পাশের মন্ত্রিগাঁও গ্রামের বাসিন্দা, শিক্ষার্থী এবং কৃষকেরা। স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে বাঁশ ও মাটি দিয়ে রাস্তা রক্ষার চেষ্টা করলেও নদীর তীব্র স্রোতের কারণে তা টেকেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা হোছন আহমদ বলেন, নদীর এই বাঁকে জরুরি ভিত্তিতে পাথর ফেলা ও কংক্রিট ব্লক বসিয়ে স্থায়ী তীর সংরক্ষণ করা না হলে অবশিষ্ট বাড়িঘর ও কৃষিজমিও রক্ষা করা সম্ভব হবে না। তিনি জানান, কয়েক বছর আগে গাছের গুঁড়ি পুঁতে ভাঙন ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, “জুড়ী নদীর ভাঙন রোধে একটি চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রতিরোধকাজ বাস্তবায়ন করা হবে।”
বরইতলীর মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুত নদীশাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং নতুন করে আর কোনো পরিবার জমি বা বসতভিটা হারাবে না। তবে এখনো তাদের সবচেয়ে বড় বেদনা—নিজেদের নামে থাকা জমিতে সীমান্তের ওপার থেকে অন্যদের চাষাবাদ করতে দেখা, অথচ কিছুই করতে না পারা।