পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিনিয়োগকারীর মার্জিন হিসাবে ইকুইটি বা নিজস্ব মূলধন মার্জিন অর্থায়নের ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই প্রয়োজনীয় সিকিউরিটিজ বিক্রি করে হিসাব সমন্বয় করতে পারবে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৩ সংশোধন করে গত ১৩ আগস্ট এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে বিএসইসি। পরে সোমবার, ১৭ আগস্ট, সংশোধিত বিধিমালাটি বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশ করা হয়। এতে কমিশনের চেয়ারম্যান মাসুদ খান স্বাক্ষর করেছেন।
সংশোধিত বিধিমালায় মার্জিন হিসাবে গ্রাহকের ইকুইটি সব সময় মার্জিন অর্থায়নের অন্তত ৫০ শতাংশ রাখার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। কোনো কারণে ইকুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে গ্রাহককে তাৎক্ষণিকভাবে মার্জিন কল দিতে হবে। লিখিতভাবে, ই-মেইল কিংবা গ্রাহকের নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে বার্তা পাঠিয়ে এ কল দেওয়া যাবে। প্রয়োজনে ফোনেও গ্রাহককে অবহিত করা যাবে।
মার্জিন কল দেওয়ার পর তিন ট্রেডিং দিনের মধ্যে গ্রাহক প্রয়োজনীয় অর্থ জমা না দিলে তাকে নতুন করে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না। তবে ইকুইটি ৫০ শতাংশে উন্নীত বা হিসাব সমন্বয়ের জন্য ওই হিসাবে থাকা প্রয়োজনীয় সিকিউরিটিজ বিক্রি করতে পারবে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান।
তবে ইকুইটি মার্জিন অর্থায়নের ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে বিধানটি আরও কঠোর হবে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহককে কোনো নোটিশ না দিয়েই প্রয়োজনীয় সিকিউরিটিজ বাধ্যতামূলকভাবে বিক্রি করতে হবে। বিক্রির আদেশ দেওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর না হলেও বা কোনো কারণে বিলম্বে কার্যকর হলেও এর ফলে সৃষ্ট ক্ষতির দায় মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তাবে না।
নতুন বিধিমালায় মার্জিন ঋণের আওতাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত শেয়ার ছাড়া অন্য কোনো সিকিউরিটিজের বিপরীতে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না। একই সঙ্গে ‘জি’, ‘এন’ ও ‘জেড’ শ্রেণির সিকিউরিটিজ এবং এসএমই, এটিবি ও ওটিসি প্ল্যাটফর্ম বা বোর্ডে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজও মার্জিন ঋণের বাইরে রাখা হয়েছে।
কোনো সিকিউরিটিজের মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই ৪০-এর বেশি হলে তার বিপরীতে মার্জিন ঋণ দেওয়া যাবে না। একইভাবে শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস ঋণাত্মক হলেও ওই সিকিউরিটিজের বিপরীতে ঋণ দেওয়া নিষিদ্ধ। তালিকাভুক্ত জীবন বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে পিইর পরিবর্তে মূল্য-অভিহিত মূল্য অনুপাত বা পিবি বিবেচনা করা হবে। পিবি ৩-এর বেশি হলে কিংবা নিট সম্পদ মূল্য বা এনএভি ঋণাত্মক হলে সেই সিকিউরিটিজও মার্জিন ঋণের জন্য অযোগ্য হবে।
মার্জিন ঋণ নেওয়ার সময় গ্রাহকের হিসাবে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে কমপক্ষে ৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ থাকতে হবে। মার্জিন ঋণের অযোগ্য কোনো সিকিউরিটিজ গ্রাহক নিজস্ব অর্থে কিনলেও সেটিকে মার্জিন অর্থায়নের জন্য তার ইকুইটি হিসেবে গণনা করা যাবে না।
একক সিকিউরিটিজে মার্জিন অর্থায়নের ক্ষেত্রেও সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান তার মোট বকেয়া মার্জিন অর্থায়নের ২০ শতাংশের বেশি কোনো একটি সিকিউরিটিজে দিতে পারবে না। পাশাপাশি কোনো প্রতিষ্ঠান তার প্রকৃত মূলধন বা নিট সম্পদের চার গুণের বেশি মার্জিন অর্থায়ন করতে পারবে না। গ্রাহকের ইকুইটির চেয়ে বেশি অর্থায়নও করা যাবে না। অর্থাৎ ইকুইটি ও মার্জিন অর্থায়নের অনুপাত সর্বোচ্চ ১:১ নির্ধারণ করা হয়েছে।
মার্জিন অর্থায়নের অর্থ শুধু মার্জিনযোগ্য সিকিউরিটিজ কেনার কাজে ব্যবহার করা যাবে। তবে নির্ধারিত ইকুইটি ও মার্জিন অর্থায়নের অনুপাত বজায় থাকলে গ্রাহক মার্জিন হিসাব থেকে অর্থ তুলতে পারবেন।
মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে নিজ নামে গ্রাহকদের মার্জিন অর্থায়নের জন্য পৃথক ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করতে হবে। এই হিসাব শুধু মার্জিন অর্থায়ন-সংক্রান্ত কার্যক্রমে ব্যবহার করা যাবে। কোনো শাখা বা ডিজিটাল বুথের নামে এ ধরনের ব্যাংক হিসাব খোলা যাবে না।
ইতোমধ্যে শাখা বা ডিজিটাল বুথের নামে পরিচালিত মার্জিন অর্থায়ন-সংক্রান্ত ব্যাংক হিসাব ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির পর কমিশনের অনুমোদন ছাড়া পরিচালনা করা যাবে না।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায়ও নতুন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে কমপক্ষে দুই সদস্যের একটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটিকে বছরে অন্তত চারটি সভা করতে হবে। এসব সভার কার্যবিবরণী পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করতে হবে।
মার্জিন চুক্তির মেয়াদ হবে এক বছর। চুক্তির কোনো পক্ষ তা বাতিল না করলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হবে। মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ১৫ দিন আগে লিখিত নোটিশ দিয়ে চুক্তি বাতিল করা যাবে।
মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব মার্জিন অর্থায়ন নীতিমালাও প্রণয়ন করতে হবে। তবে এ নীতিমালায় সংশোধিত বিধিমালার কোনো শর্ত শিথিল করা বা নতুন কোনো শর্ত আরোপ করা যাবে না।
ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক মার্জিন অর্থায়ন চালু করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড থাকতে হবে। ওই বোর্ড বা শরিয়াহ উপদেষ্টার সুপারিশের ভিত্তিতে এ-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
এ ছাড়া মার্জিন অর্থায়নকারীর গবেষণা দলের সদস্যদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা সরাসরি প্রতিষ্ঠানের ট্রেডিং কমিশন আয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যাবে না। মার্জিনযোগ্য সিকিউরিটিজ নির্ধারণের সুবিধার্থে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে পিই এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পিবি অনুপাত নিয়মিতভাবে নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।
সংশোধিত বিধিমালায় একই গ্রাহকের একটি নগদ হিসাব ও একটি মার্জিন হিসাব একসঙ্গে চালু বা রাখার সুযোগও রাখা হয়েছে।
বিএসইসির নতুন বিধানগুলো মূলত মার্জিন ঋণের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগকারীর হিসাব ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং অতিরিক্ত ঋণনির্ভর বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যেই আনা হয়েছে। বিশেষ করে ইকুইটি ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে নোটিশ ছাড়াই সিকিউরিটিজ বিক্রির বিধান কার্যকর হওয়ায় বাজারের তীব্র দরপতনের সময় মার্জিন হিসাব ব্যবস্থাপনায় অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব ও ক্ষমতা আরও স্পষ্ট হলো।