একই ব্যবহার, বিল দ্বিগুণ-তিন গুণ
অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলে নাজেহাল গ্রাহক, দায় কার?
বিশেষ প্রতিবেদন
মাসজুড়ে লোডশেডিং। দিনের পর দিন নির্ধারিত সময়ের বাইরে বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়েছে পরিবারকে। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে অনেক সময় এসি তো দূরের কথা, ফ্যানও চলেনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অথচ মাস শেষে হাতে এসেছে আগের চেয়ে দ্বিগুণ, কোথাও তিন গুণ পর্যন্ত বেশি বিদ্যুৎ বিল। বাস্তবতার সঙ্গে যার কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা।
এ দৃশ্য শুধু একটি জেলা বা একটি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির নয়। বরগুনার বেতাগী, দিনাজপুরের হিলি, ঢাকার উপকণ্ঠ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলতি মাসে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অভিযোগের ঢল নেমেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো গ্রাহক আগের ও বর্তমান মাসের বিল পাশাপাশি প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলেছেন—বিদ্যুতের ব্যবহার না বাড়লেও বিল এত বাড়ল কীভাবে?
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিদ্যুৎ বিভাগকেও ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। বিভাগটি স্বীকার করেছে, কিছু ক্ষেত্রে করণিক বা মানবিক ত্রুটির কারণে ভুল বিল তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি নতুন বিদ্যুৎহার কার্যকর হওয়া এবং গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বৃদ্ধি অতিরিক্ত বিলের অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের প্রশ্ন, মানবিক ভুল যদি হয়, তাহলে একই সময়ে দেশের এত জায়গায় একই ধরনের অভিযোগ কেন?
দুই জেলার গল্প, একই অভিযোগ
বরগুনার বেতাগীর বাসিন্দা জসিম উদ্দীনের পরিবারে বিদ্যুৎ ব্যবহার আগের মতোই। তবু গত মাসে যেখানে বিল ছিল প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা, সেখানে চলতি মাসে বিল এসেছে প্রায় ৪ হাজার টাকা। মিটারের রিডিংয়েও দেখা গেছে বড় ধরনের ব্যবধান। তার অভিযোগ, প্রকৃত ব্যবহার অনুযায়ী এই বিল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন বেতাগী বন্দরের ব্যবসায়ী রুবেল মল্লিক। তার ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে মিটার রিডিং নিতে কর্মীরা নিয়মিত আসেন না। পরে অনুমান করে ইউনিট বসিয়ে বিল তৈরি করা হয়। এর ফলে একেক মাসে অস্বাভাবিক বিলের বোঝা চাপছে গ্রাহকদের ওপর।
দিনাজপুরের হিলিতেও একই চিত্র। স্থানীয় বাসিন্দা বিপ্লব হোসেন জানান, কয়েক মাস আগেও তার মাসিক বিদ্যুৎ বিল ছিল দুই হাজার থেকে দুই হাজার ২০০ টাকার মধ্যে। এরপর তা বেড়ে তিন হাজার ৭০০ টাকা হয়। আর চলতি মাসে বিল এসেছে সাত হাজার টাকার বেশি। অথচ বাড়িতে নতুন কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করা হয়নি।
হিলি বাজারের ব্যবসায়ীরাও একই অভিযোগ তুলেছেন। তাদের ভাষ্য, দোকানের বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও বিল বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। এতে ব্যবসার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
শুধু দুটি জেলা নয়
ভোক্তা অধিকার সংগঠন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও মিটার রিডিংয়ে অসঙ্গতি, কোথাও একাধিক মাসের ইউনিট একসঙ্গে যোগ হওয়া, আবার কোথাও নতুন ট্যারিফের প্রভাব নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
অনেক গ্রাহক অভিযোগ করছেন, বিল সংশোধনের জন্য অফিসে গিয়ে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ নিষ্পত্তি হতে সময় লাগছে, অথচ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধ না করলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের ব্যাখ্যা
অভিযোগ বাড়তে থাকায় বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, কিছু ক্ষেত্রে করণিক ভুলের কারণে অতিরিক্ত বিল তৈরি হয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে দ্রুত সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে বিভাগটির ব্যাখ্যা, জুন থেকে নতুন বিদ্যুৎহার কার্যকর হয়েছে। পাশাপাশি প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুতের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে অনেক গ্রাহক উচ্চতর ট্যারিফ স্ল্যাবে চলে গেছেন। এর প্রভাবও বিলে পড়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যদি শুধু ট্যারিফ বৃদ্ধিই কারণ হয়, তাহলে একই ব্যবহার থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো গ্রাহকের বিল কেন দ্বিগুণ বা তিন গুণ হবে?
ট্যারিফ বৃদ্ধি কতটা প্রভাব ফেলেছে?
চলতি বছরের জুন থেকে পাইকারি ও খুচরা—উভয় পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। পাইকারি পর্যায়ে প্রায় ২০ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে গড়ে প্রায় ১৭ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য সমন্বয় করা হয়। পরবর্তীতে স্বল্প ব্যবহারের গ্রাহকদের জন্য কিছুটা সমন্বয় আনা হলেও অধিকাংশ গ্রাহক নতুন ট্যারিফের আওতায় রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্যারিফ বাড়ার ফলে বিল বাড়বে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু ব্যবহার প্রায় অপরিবর্তিত রেখে বিল দ্বিগুণ হওয়ার ব্যাখ্যা শুধু ট্যারিফ দিয়ে দেওয়া যায় না। সেখানে অবশ্যই মিটার রিডিং, বিল প্রস্তুত বা হিসাবের অন্য কোনো সমস্যা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
মিটার রিডিং নিয়েই যত প্রশ্ন
বিদ্যুৎ খাতের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, দেশের অনেক এলাকায় এখনো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে মিটার রিডিং নেওয়া হয়। ফলে ভুল হওয়ার সুযোগ থেকে যায়।
অনেক সময় নির্ধারিত মাসে রিডিং নেওয়া না হলে পরের মাসে দুই মাসের ইউনিট একসঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনুমানভিত্তিক বিল তৈরি করা হয়। পরে প্রকৃত রিডিং যুক্ত হলে বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
গ্রাহকদের অভিযোগ, এসব ভুলের দায় শেষ পর্যন্ত তাদেরই বহন করতে হয়।
লোডশেডিংয়ের বাস্তবতা
অতিরিক্ত বিলের আরেকটি বড় প্রশ্ন এসেছে লোডশেডিংকে ঘিরে।
অনেক গ্রাহক বলছেন, দিনে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যবহার স্বাভাবিকভাবেই কমার কথা। তাহলে বিল বাড়ল কীভাবে?
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, লোডশেডিং থাকলেও তীব্র গরমে যখন বিদ্যুৎ এসেছে, তখন অনেকেই এসি, ফ্রিজ, পানির পাম্পসহ বিভিন্ন যন্ত্র বেশি ব্যবহার করেছেন। তবে এই ব্যাখ্যা সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলেই মনে করছেন জ্বালানি বিশ্লেষকেরা।
স্মার্ট মিটার কি সমাধান?
বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মার্ট ও প্রিপেইড মিটারই এ সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে।
স্মার্ট মিটারে রিয়েল-টাইম তথ্য পাওয়া যায়। মিটার রিডার গিয়ে ইউনিট লেখার প্রয়োজন হয় না। ফলে মানবিক ভুলের সুযোগ কমে যায়। গ্রাহক নিজেও যে কোনো সময় নিজের ব্যবহার দেখতে পারেন।
সরকার ইতোমধ্যে কয়েক মিলিয়ন প্রিপেইড মিটার স্থাপন করেছে। তবে দেশের বিপুলসংখ্যক গ্রাহক এখনো প্রচলিত পোস্টপেইড মিটারের ওপর নির্ভরশীল।
অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে
গ্রাহকদের অভিযোগ, বিল ভুল প্রমাণ করাও সহজ নয়।
বিল সংশোধনের জন্য আবেদন, অফিসে বারবার যাওয়া, মিটার পরীক্ষা, নতুন বিল প্রস্তুত—সব মিলিয়ে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অনেকেই সময় ও ঝামেলার কারণে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করে দেন।
ভোক্তা অধিকারকর্মীদের মতে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা এবং অনলাইন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
আস্থা সংকটে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা
বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা অনেকাংশে নির্ভর করে বিলিং ব্যবস্থার ওপর। একজন গ্রাহক যদি নিশ্চিত না হন যে তিনি প্রকৃত ব্যবহারের ভিত্তিতেই বিল দিচ্ছেন, তাহলে পুরো ব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস তৈরি হয়।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের বড় বিনিয়োগ, উৎপাদন বৃদ্ধি কিংবা নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি গ্রাহকসেবার মান উন্নয়ন এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভুল বিল শুধু একজন গ্রাহকের আর্থিক ক্ষতিই করে না, পুরো সেবাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
কী করা দরকার
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সংকট এড়াতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, শতভাগ নির্ভুল মিটার রিডিং নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দ্রুত স্মার্ট মিটার স্থাপনের কাজ শেষ করতে হবে। তৃতীয়ত, বিল তৈরির পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করতে হবে। চতুর্থত, অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে। পাশাপাশি ভুল প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
বিদ্যুৎ আজ শুধু একটি সেবা নয়; আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অবকাঠামো। সেই সেবার বিনিময়ে গ্রাহক বিল দেবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বিল যদি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে শুধু গ্রাহকের পকেটই নয়, রাষ্ট্রীয় সেবাব্যবস্থার ওপরও আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অতএব, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলকে বিচ্ছিন্ন কিছু ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন জনআস্থার প্রশ্ন। তদন্ত, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির মাধ্যমে দ্রুত সমাধান না এলে এই অসন্তোষ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।