আপনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নতুনভাবে, সংবাদপত্রের উপযোগী ভাষায় বিস্তারিত প্রতিবেদনটি নিচে দেওয়া হলো।
জিপিএস ছাড়া মিলবে না নিবন্ধন-ফিটনেস
আজ থেকে গণপরিবহনে নতুন নিয়ম, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের বড় পদক্ষেপ
দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালুর পথে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। আজ শুক্রবার মধ্যরাত পেরিয়ে শনিবার (১ আগস্ট) থেকে দেশের সব গণপরিবহনে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) ডিভাইস সংযোজন ও সচল রাখা বাধ্যতামূলক হচ্ছে। নতুন এ ব্যবস্থার আওতায় কোনো বাস, মিনিবাস বা অন্যান্য গণপরিবহনে জিপিএস সংযুক্ত না থাকলে নতুন নিবন্ধন দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে ফিটনেস সনদ প্রদান কিংবা নবায়নের ক্ষেত্রেও জিপিএস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের সড়কে গণপরিবহনের বেপরোয়া চলাচল, রুট পারমিট অমান্য, নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে যাত্রী ওঠানামা এবং যাত্রী তোলাকে কেন্দ্র করে বাসের রেষারেষির কারণে দুর্ঘটনা ও যানজট বেড়েছে। এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই জিপিএস বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ আগস্ট থেকে যেকোনো নতুন গণপরিবহনের নিবন্ধনের সময় সংশ্লিষ্ট মালিককে জিপিএস ডিভাইস সংযোজনের প্রমাণ দেখাতে হবে। শুধু ডিভাইস লাগানো থাকলেই হবে না, সেটি কার্যকর অবস্থায় রয়েছে কি না, তাও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রদর্শন করতে হবে। একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে ফিটনেস সনদ প্রদান ও নবায়নের ক্ষেত্রেও।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানিয়েছে, জিপিএসের মাধ্যমে প্রতিটি যানবাহনের অবস্থান, চলাচলের গতি, নির্ধারিত রুট অনুসরণ এবং কোথায় কতক্ষণ থামছে—এসব তথ্য পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। ফলে রুট ভঙ্গ, অতিরিক্ত গতিতে চালানো কিংবা অনুমোদিত রুটের বাইরে চলাচলের মতো অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করা যাবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতিতেও যানবাহনের অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে জানা সহজ হবে।
দেশের সড়কে প্রতিদিনই দেখা যায়, যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় একাধিক বাস পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পড়ে, নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়াই যাত্রী ওঠানামা করায় এবং হঠাৎ লেন পরিবর্তন করে। এতে যেমন দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়, তেমনি বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও অন্যান্য বড় শহরে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা এখন প্রায় নিত্যদিনের চিত্র। সরকারের আশা, জিপিএসভিত্তিক নজরদারির মাধ্যমে এসব অনিয়ম উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, পরিবহন মালিকদের সঙ্গে বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের চুক্তি হয়েছে এবং অনেক পরিবহনে ইতোমধ্যে জিপিএস স্থাপন শুরু হয়েছে। তবে দেশের সব গণপরিবহনে প্রথম দিন থেকেই শতভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। কারণ হাজার হাজার যানবাহনে নতুন করে ডিভাইস স্থাপন, পরীক্ষা ও সক্রিয় করতে কিছুটা সময় লাগবে। তিনি বলেন, মালিকরা সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছেন এবং পর্যায়ক্রমে সব যানবাহন এ ব্যবস্থার আওতায় চলে আসবে।
বিআরটিএ চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, নতুন কোনো যানবাহনের নিবন্ধনের আবেদন এলে সেটিতে জিপিএস সংযুক্ত রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে। একইভাবে ফিটনেস নবায়নের সময়ও জিপিএস সচল থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। এ জন্য বিআরটিএ নিজস্ব প্রযুক্তিগত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, যাতে সহজেই কোনো যানবাহনের জিপিএস কার্যকর রয়েছে কি না তা যাচাই করা যায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শুধু জিপিএস সংযোজন করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। ডিভাইসটি সার্বক্ষণিক সচল রাখতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ রাখা বা বিকল অবস্থায় রাখার অভিযোগ পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও রাখা হচ্ছে। এ বিষয়ে পর্যায়ক্রমে আরও নির্দেশনা জারি করা হবে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বাস্তবায়ন নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, অতীতেও সড়ক খাতে নানা প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুর্বল তদারকি ও জবাবদিহির অভাবে অনেক উদ্যোগই প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। তাই এবার শুধু প্রযুক্তি স্থাপন নয়, সেটির নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, প্রযুক্তি অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু প্রযুক্তি একা কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না। সড়ক ব্যবস্থাপনায় সুশাসন, কার্যকর নজরদারি, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে কেবল জিপিএস সংযোজন করে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, প্রযুক্তিকে প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সুশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারলেই এর প্রকৃত সুফল মিলবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে দেশের সড়কে বহু পুরোনো ও জরাজীর্ণ গণপরিবহন চলাচল করছে। এসব যানবাহনে জিপিএস বসানো হলেও সড়ক নিরাপত্তার মূল সমস্যাগুলোর সমাধান হবে না, যদি চালকদের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা, রুট পারমিট লঙ্ঘন, অদক্ষ চালক নিয়োগ এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল বন্ধ করা না যায়। ফলে জিপিএসকে একটি সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে হবে; একই সঙ্গে প্রয়োজন পরিবহন খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, নিয়মিত মনিটরিং এবং কঠোর আইন প্রয়োগ।
সংশ্লিষ্টদের আশা, নতুন এ ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে গণপরিবহনের চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরবে, যাত্রীসেবা উন্নত হবে এবং সড়কে দুর্ঘটনা ও যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করবে প্রযুক্তির পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক তদারকি, প্রশাসনিক আন্তরিকতা এবং পরিবহন মালিক ও চালকদের সহযোগিতার ওপর।