চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। মাসটিতে উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের কোনো অর্থই খরচ করতে পারেনি সরকারের ১০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এর মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের উন্নয়ন বরাদ্দ হাজার কোটি টাকার বেশি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এডিপিতে মোট ৩ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এর বিপরীতে জুলাই মাস শেষে ব্যয় হয়েছে মাত্র ২ হাজার ১২১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশে।
এ হার আগের দুই অর্থবছরের প্রথম মাসের তুলনায়ও কম। ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাইয়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ১ শতাংশের বেশি। গত অর্থবছরের প্রথম মাসেও বাস্তবায়নের হার ছিল একই পর্যায়ে।
জুলাইয়ে কোনো অর্থ ব্যয় করতে না পারা ১০ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে রয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, সেতু বিভাগ এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ।
এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কয়েকটির উন্নয়ন বরাদ্দের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রয়েছে ৬ হাজার ১৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য বরাদ্দ ৫ হাজার ৪৯৯ কোটি ১২ লাখ টাকা। সেতু বিভাগের বরাদ্দ ২ হাজার ৫৯৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ১ হাজার ৮৬৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
এ ছাড়া ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ ১ হাজার ৩৭০ কোটি ৩ লাখ টাকা, শিল্প মন্ত্রণালয়ের ১ হাজার ২৫৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ১ হাজার ১৪৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এসব বরাদ্দের বিপরীতে জুলাইয়ে কোনো অর্থ ব্যয় দেখাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ।
তবে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের উন্নয়ন ব্যয়ের চিত্র একই রকম নয়। জুলাইয়ে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। চলতি অর্থবছরে বিভাগটির জন্য ৩৩ হাজার ৩৭৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে ব্যয় হয়েছে ৯৫১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জুলাইয়ে ব্যয় করেছে ২৬৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগ ব্যয় করেছে ২০৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ১৯২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৬৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ব্যয় করেছে ৮১ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
বরাদ্দের তুলনায় শতাংশের হিসাবে জুলাইয়ে সবচেয়ে বেশি এডিপি বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন। সংস্থাটির জন্য ২৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও প্রথম মাসেই ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ফলে বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৫২ শতাংশে।
সংসদ বিষয়ক সচিবালয় জুলাইয়ে তার উন্নয়ন বরাদ্দের প্রায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ ব্যয় করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন ব্যয় করেছে প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ও তার বরাদ্দের ৫ শতাংশের বেশি অর্থ জুলাইয়ে খরচ করেছে।
উন্নয়ন ব্যয়ের এই ধীরগতির কারণ হিসেবে প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তুতিকে সামনে আনছে পরিকল্পনা বিভাগ। পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার বলেন, জুলাই-আগস্ট মাসে প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া ও ক্রয় পরিকল্পনা তৈরিতে সময় চলে যায়। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করতেও অনেক ক্ষেত্রে অক্টোবর পর্যন্ত সময় লাগে। মূলত সেপ্টেম্বর থেকে প্রকল্পের বাস্তব ব্যয় শুরু হয়। এ কারণে অর্থবছরের শুরুতে এডিপি বাস্তবায়নের হার কিছুটা কম থাকে।
তবে এডিপির প্রথম মাসের এই ধীরগতি শুধু আনুষ্ঠানিকতার বিষয় হিসেবে দেখলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে। প্রকল্প অনুমোদনের পর অর্থ ছাড়, দরপত্র, ঠিকাদার নিয়োগ, জমি অধিগ্রহণ, নকশা ও কারিগরি প্রস্তুতি—বিভিন্ন ধাপে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হওয়ায় অনেক প্রকল্প বছরের শেষ দিকে এসে ব্যয়ের চাপ তৈরি করে।
অর্থবছরের শুরুতে ব্যয় কম হওয়া বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটে নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে বছরের শেষদিকে দ্রুত অর্থ খরচের প্রবণতা প্রকল্পের মান, ব্যয়ের কার্যকারিতা এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। তাই শুধু বরাদ্দ বাড়ানো নয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরু থেকেই প্রস্তুতি ও ক্রয়প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
চলতি অর্থবছরে ৩ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকার এডিপি বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। প্রথম মাসে এর মাত্র শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ ব্যয় হওয়ায় বাকি ১১ মাসে বাস্তবায়নের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। বিশেষ করে জুলাইয়ে যেসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ কোনো অর্থ ব্যয় করতে পারেনি, তাদের প্রকল্পগুলোর প্রস্তুতি, দরপত্র ও বাস্তবায়ন অগ্রগতি দ্রুত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। না হলে অর্থবছরের শেষ দিকে কেবল বরাদ্দ ব্যয়ের লক্ষ্যে তাড়াহুড়ো করে অর্থ খরচের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।