প্রায় দুই দশক পর কলকাতায় তসলিমা নাসরিন
২০০৭ সালে সহিংসতার মুখে শহর ছাড়তে হয়েছিল; শনিবার রবীন্দ্র সদনের অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখিকা
প্রায় ১৯ বছর পর আবারও কলকাতায় ফিরেছেন নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। ২০০৭ সালে তার লেখালেখিকে কেন্দ্র করে সহিংস বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা সংকটের মুখে যে শহর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, দীর্ঘ বিরতির পর সেই কলকাতায় ফিরে শনিবার একটি জনসম্মুখ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন তিনি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, শুক্রবার সকালে কলকাতার নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তসলিমা নাসরিন। বিমানবন্দরে তাকে লাল পাড়ের সাদা শাড়ি ও কালো সানগ্লাস পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। দীর্ঘদিন পর কলকাতায় ফিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় তিনি বলেন, “খুবই ভালো লাগছে। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।”
কলকাতায় রওনা হওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটিপোস্টও করেন তসলিমা। নিজের একটি ছবি প্রকাশ করে তিনি লেখেন, “আজি এ প্রভাতে কলিকাতা অভিমুখে যাত্রা করিলাম।” তার এই পোস্ট প্রকাশের পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার কলকাতার ঐতিহাসিক রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন তসলিমা নাসরিন। অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যদিও তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
![]()
বিমানবন্দরে তসলিমাকে স্বাগত জানান দমদম উত্তরের বিজেপি বিধায়ক সৌরভ সিকদার এবং অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক মোহিত রায়। আয়োজকরা জানান, দীর্ঘদিন পর কলকাতায় তসলিমার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে নানা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণের আশা করা হচ্ছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ঘটনার পর এবারই প্রথমবারের মতো কলকাতায় কোনো উন্মুক্ত অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন তসলিমা নাসরিন। ফলে তার এই সফর শুধু সাহিত্য অঙ্গনেই নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
তসলিমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ‘সেক্যুলার মিশন’ এবং ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাইটার্স ফাউন্ডেশন (এইচআরবিএফএফ)’ নামে দুটি সংগঠন। আয়োজকদের দাবি, ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অবস্থান, মানবাধিকার এবং বাকস্বাধীনতার পক্ষে লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে তাকে সম্মান জানাতেই এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
তসলিমা নাসরিন ১৯৬২ সালে ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন। আশির দশকে কবি হিসেবে সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ করলেও পরে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও আত্মজীবনীমূলক রচনার মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি পান। নারী অধিকার, লিঙ্গসমতা, ধর্মীয় রক্ষণশীলতার সমালোচনা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে তার লেখালেখি দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
নব্বইয়ের দশকে তার বিভিন্ন লেখা, বিশেষ করে ধর্মীয় বিষয়ে সমালোচনামূলক অবস্থানের কারণে দেশে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে হত্যার হুমকি ও নিরাপত্তা সংকটের মুখে ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। এরপর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দেশে বসবাসের পর ২০০৪ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন।
তবে কলকাতায় বসবাসও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০০৭ সালে তার আত্মজীবনী ‘দ্বিখণ্ডিত’ প্রকাশকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে তীব্র বিক্ষোভ, সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সে সময় রাজ্য সরকারের উদ্যোগে তাকে কলকাতা ছাড়তে হয়। পরে দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে সীমিত পরিসরে অবস্থান করলেও আর স্থায়ীভাবে কলকাতায় ফেরা হয়নি।
গত প্রায় দুই দশকে কয়েকবার কলকাতায় যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে একাধিক অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে যায়। ফলে এবারের সফরকে অনেকেই প্রতীকী ও তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন এক সময়ে তসলিমা নাসরিন কলকাতায় ফিরলেন, যখন দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, লেখকদের নিরাপত্তা এবং নির্বাসিত বুদ্ধিজীবীদের অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর কলকাতায় তার প্রকাশ্য উপস্থিতি সেই বিতর্ক ও আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।