৫ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করল অ্যাপল, ইতিহাসে দ্বিতীয় কোম্পানি
প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল প্রথমবারের মতো ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্যের মাইলফলক স্পর্শ করে নতুন ইতিহাস গড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার লেনদেন চলাকালে কোম্পানিটির বাজারমূল্য সাময়িকভাবে ৫ দশমিক ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। যদিও দিনের শেষ দিকে শেয়ারদর কিছুটা কমে আসায় বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪ দশমিক ৯৮ ট্রিলিয়ন ডলারে। খবর রয়টার্সের।
এর মাধ্যমে বিশ্বের দ্বিতীয় কোম্পানি হিসেবে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য স্পর্শ করল অ্যাপল। এর আগে গত অক্টোবরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের উত্থানের সুবাদে বিশ্বের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ মাইলফলক অতিক্রম করে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া।![]()
মঙ্গলবার অ্যাপলের শেয়ারদর ০.৭২ শতাংশ বেড়ে ৩৩৯ দশমিক ৩৩ ডলারে ওঠে। একপর্যায়ে শেয়ারের দাম ৩৪২ দশমিক ৮৯ ডলারে পৌঁছালে কোম্পানিটির বাজারমূল্য ৫ দশমিক ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়।
চলতি মাসের শুরুতেই অ্যাপল বাজারমূল্যের দিক থেকে আবারও বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানির অবস্থান ফিরে পায়। ২০২৫ সালের জুন থেকে এনভিডিয়া এ অবস্থানে ছিল। মঙ্গলবার এনভিডিয়ার শেয়ারদরও ০.৫৩ শতাংশ বেড়ে ১৯৭ দশমিক ৬৩ ডলারে উঠলেও কোম্পানিটির বাজারমূল্য দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৭৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, অ্যাপলের শক্তিশালী বাজারমূল্যের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে পণ্যের ধারাবাহিক চাহিদা এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কৌশল। প্রযুক্তি খাতের অন্য বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে নিজস্ব এআই অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিবর্তে অ্যাপল তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়সাপেক্ষ কৌশল বেছে নিয়েছে। নিজস্ব বিশাল ডেটা সেন্টার তৈরির বদলে প্রতিষ্ঠানটি গুগলের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন সেবা চালু করছে, যার অন্যতম উদাহরণ নতুন সংস্করণের সিরি।![]()
এ কৌশলের ফলে অবকাঠামো নির্মাণে বড় বিনিয়োগের চাপ এড়াতে পেরেছে অ্যাপল, যা বিনিয়োগকারীদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত অ্যাপলের শেয়ারদর প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে এনভিডিয়া, মেটা, অ্যালফাবেট ও মাইক্রোসফটসহ তথাকথিত ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’-এর বেশির ভাগ কোম্পানিকেই পারফরম্যান্সে ছাড়িয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মূল্যনীতিও অ্যাপলের বিক্রি বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। গত মাসে নতুন ম্যাকবুক ও আইপ্যাডের দাম বাড়ানো হলেও আইফোনের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। বছরের শেষ দিকে আইফোনের দাম বাড়তে পারে—এমন প্রত্যাশায় অনেক ক্রেতা আগেভাগেই নতুন ডিভাইস কিনে নেওয়ায় স্মার্টফোন বিক্রি বেড়েছে।
বিআরআই ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের বিনিয়োগ বিভাগের প্রধান টনি মেডোজ বলেন, একসময় অ্যাপলকে এআই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধারণা বদলাতে শুরু করেছে।![]()
এদিকে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ‘ডিভাইস লিজিং’ কর্মসূচিও চালু করেছে অ্যাপল। আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান ক্লারনার সহযোগিতায় চালু হওয়া এ কর্মসূচির আওতায় মাসিক কিস্তিতে অ্যাপলের বিভিন্ন ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে। এতে মাসে ১৭ দশমিক ৯৯ ডলার থেকে আইফোন, ১১ দশমিক ৯৯ ডলার থেকে অ্যাপল ওয়াচ বা আইপ্যাড এবং ২৪ দশমিক ৯৯ ডলার থেকে ম্যাক ব্যবহার করার সুযোগ থাকবে।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরেস্টারের ভাইস প্রেসিডেন্ট দীপাঞ্জন চ্যাটার্জির মতে, এআই ব্যয়ের প্রতিযোগিতায় না গিয়ে গ্রাহকের ব্যবহার অভিজ্ঞতার ওপর গুরুত্ব দেওয়াই অ্যাপলের বড় শক্তি। নতুন লিজিং কর্মসূচিও সেই কৌশলের অংশ, যা এককালীন বড় অর্থ পরিশোধের পরিবর্তে মাসিক কিস্তির মাধ্যমে ডিভাইস কেনাকে আরও সহজ করেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে অ্যাপলের আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। শক্তিশালী বিক্রি, স্থিতিশীল মূল্যনীতি এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কৌশল এ প্রবৃদ্ধিকে আরও এগিয়ে নেবে বলে তাদের প্রত্যাশা।
অন্যদিকে, এনভিডিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েও বাজারে আশাবাদ রয়েছে। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য ব্যবহৃত গ্রাফিকস প্রসেসর (জিপিইউ) বাজারে এখনো শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সেগাল মার্কো অ্যাডভাইজরসের আলফা রিসার্চ বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন হল বলেন, অ্যাপল ও এনভিডিয়ার বর্তমান অবস্থানের মধ্যে মৌলিক কোনো বড় পার্থক্য নেই। এআই খাতের ভবিষ্যৎ যেদিকেই এগোক না কেন, এনভিডিয়া সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেই থাকবে।
২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি উন্মুক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। বর্তমানে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি, গুগলের জেমিনি, অ্যানথ্রোপিকের ক্লড এবং মেটার লামাসহ অধিকাংশ বড় এআই মডেলই এনভিডিয়ার জিপিইউ ও সিইউডিএ প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়েছে।