দুই দশকের সাংবাদিকতা পেরিয়ে বিটিভির মহাপরিচালক কাজী জেসিন
রাজু আলীম
বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মহাপরিচালক (গ্রেড-১) পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন সাংবাদিক, লেখক ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা কাজী জেসিন। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা, টেলিভিশন অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, উপস্থাপনা ও নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত থাকা কাজী জেসিন এবার দেশের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে দায়িত্ব পেলেন।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০১-এর ১১(২) ধারা অনুযায়ী অন্য যেকোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধা-সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য কাজী জেসিনকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক (গ্রেড-১) পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের নেতৃত্বে আসা কাজী জেসিনের পেশাগত পরিচয় অবশ্য কেবল একজন টেলিভিশন উপস্থাপকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাংবাদিকতা, অনুষ্ঠান নির্মাণ, রাজনৈতিক টকশো, অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান, লেখালেখি এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ—দীর্ঘ সময় ধরে এসব ক্ষেত্রেই সক্রিয় তিনি। সাংবাদিকতার পাশাপাশি লেখালেখিতেও সক্রিয় কাজী জেসিন। রাজনীতি, গণতন্ত্র, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি ও জননীতি বিষয়ে তাঁর নিবন্ধ ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে BBC Bangla, New Age, Asia Times এবং ভারতের Scroll.in-সহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে জ্যোৎস্নামত্ত যাত্রা ও তানানুম তানানুম। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে কর্মজীবনে তিনি তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল প্রশাসন ও প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। Comcast (NBCUniversal)-এর প্রযুক্তি বিভাগে সম্প্রচার ও ওটিটি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার পর Bank of America-তে জেল (Zelle) লেনদেনের জালিয়াতি প্রতিরোধ-সংক্রান্ত এন্টারপ্রাইজ প্রযুক্তি দলে দায়িত্ব পালন করেন। পরে নিউইয়র্ক সিটি সরকারের Department of Parks & Recreation-এ প্রযুক্তি ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত দায়িত্বে থেকে ই-গভর্ন্যান্স, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালে আন্তর্জাতিক পেশাগত কর্মসূচিতেও যুক্ত ছিলেন কাজী জেসিন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের International Visitor Leadership Program (IVLP)-এ নিউ মিডিয়া প্রযুক্তি বিষয়ে ফেলো হিসেবে অংশ নেন। Columbia University থেকে Digital Marketing Strategy বিষয়ে পেশাগত সনদও অর্জন করেন।
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ফিরে গণমাধ্যমের পাশাপাশি গণতন্ত্র, নারী নেতৃত্ব ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ শুরু করেন কাজী জেসিন। Women in Democracy (WinD)-এর আহ্বায়ক হিসেবে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব বিকাশ, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছেন তিনি। একই সঙ্গে International Foundation for Electoral Systems (IFES)-এর Women Against Violence in Elections (WAVE) কর্মসূচির উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। নির্বাচনী সহিংসতা প্রতিরোধ এবং নারী রাজনৈতিক কর্মীদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ নিয়ে এ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা ও পেশাগত নেটওয়ার্কের সঙ্গেও কাজী জেসিনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। U.S. National Press Club, South Asian Journalists Association (SAJA), Asian American Journalists Association (AAJA) এবং Women’s Media Group, New York-এর সদস্য হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা অঙ্গনের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
গাইবান্ধায় জন্ম নেওয়া কাজী
জেসিন ছোটবেলা থেকেই বই পড়া ও লেখালেখির প্রতি আগ্রহী ছিলেন। ২০০৭ সালের একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, স্কুলজীবন থেকেই ছোটগল্প লেখার সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। পরে ঢাকায় এসে লেখালেখি ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
১৯৯৭ সালে একটি লিটল ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ লেখার মধ্য দিয়ে তার নিয়মিত লেখালেখির সূচনা। এরপর ধীরে ধীরে যুক্ত হন গণমাধ্যমে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে তিনি দেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতার পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও গণমাধ্যমের বাইরের বিভিন্ন বিষয়ে তার আগ্রহের প্রতিফলন রয়েছে। তিনি রবার্ট কেনেডি কলেজ এবং ইউনিভার্সিটি অব কামব্রিয়া থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। নেতৃত্ব ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে মাস্টার অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এমবিএ) ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি।
টেলিভিশনে তার পেশাগত যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় এনটিভি। ২০০৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত এনটিভিতে সংবাদ ও সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে কাজ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে একুশে টেলিভিশন, চ্যানেল ওয়ান, বাংলাভিশন ও যমুনা টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন।
রাজনৈতিক ও সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান উপস্থাপনার ক্ষেত্রে কাজী জেসিনের বিশেষ পরিচিতি তৈরি হয় ২০০৬ সালের দিকে। সে সময় তিনি রাজনৈতিক টকশো উপস্থাপনায় একটি নতুন ধারা তৈরি করেন। নারী উপস্থাপক হিসেবে রাজনৈতিক টকশোকে নিয়মিতভাবে সামনে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত হয়। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ উইমেন জার্নালিস্টস ফোরাম তাকে টেলিভিশন সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ‘এক্সিলেন্স ইন জার্নালিজম’ পুরস্কারে সম্মানিত করে। পুরস্কারটির ক্ষেত্রে তার দীর্ঘ সাংবাদিকতা এবং বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে কাজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
কাজী জেসিনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত অনুষ্ঠানগুলোর একটি ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’। অনুষ্ঠানটি রাজনৈতিক ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন, বিতর্ক এবং আলোচনার জন্য দর্শকের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি পায়। অনুষ্ঠানের পরিচালক ও উপস্থাপক হিসেবে তিনি আলোচনায় উঠে আসেন। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠানটি ঘিরে তাকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় তার বাসায় কাফনের কাপড় ও হুমকিসংবলিত একটি চিঠি পাঠানো হয়। পরে তিনি মোহাম্মদপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন এবং নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়েছিলেন।
‘পয়েন্ট অব অর্ডার’ শুধু একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান হিসেবে নয়, বাংলাদেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতার একটি আলোচিত অধ্যায় হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে এর পুনঃপ্রচারের দাবিও উঠেছিল। কাজী জেসিনের সাংবাদিকতা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে অনুষ্ঠানটির প্রভাব এবং তার নির্ভীক উপস্থাপনার বিষয়টি উঠে এসেছে।
২০০৮ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত একুশে টেলিভিশনের ‘একুশে সংকেত’ অনুষ্ঠানের পরিচালক ও উপস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০৯ থেকে ২০১০ সালে ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০০৬ থেকে ২০০৭ সালে দৈনিক রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ‘আক্তেল প্রোটিন’-এর উপস্থাপক ও গবেষক হিসেবেও কাজ করেন। একই সময়ে একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে যুগ্ম বার্তা সম্পাদক ও অনুষ্ঠান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন।
নারী অধিকার নিয়েও কাজী জেসিনের টেলিভিশন কাজের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় রয়েছে। ‘পদ্মরাগ’ নামে নারী অধিকারভিত্তিক অনুষ্ঠানের পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও উপস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ফলে তার পেশাগত অভিজ্ঞতার পরিধি কেবল রাজনৈতিক টকশো বা সংবাদ উপস্থাপনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; সামাজিক ইস্যু, নারী অধিকার ও সমসাময়িক বিষয়ও তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত স্বাধীন মিডিয়া প্রোডাকশন হাউস ‘বায়োস্কোপ’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স ও ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কাজী জেসিন। এ সময় অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ও নির্মাণের পাশাপাশি গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা তৈরি হয়।![]()
২০১৪ সালে যমুনা টেলিভিশনে দৈনিক রাজনৈতিক টকশোর পরিকল্পনাকারী ও উপস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণের পাশাপাশি সংবাদ, রাজনীতি ও সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তার দীর্ঘদিনের কাজ তাকে দেশের পরিচিত টেলিভিশন সাংবাদিকদের একজন করে তুলেছে।
আত্মজীবনীমূলক অনুষ্ঠান ‘তিনি’ও তার ক্যারিয়ারের অন্যতম পরিচিত কাজ। এই অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত জীবন, পেশাগত পথচলা, মূল্যবোধ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করা হতো। ২০০৭ সালে একুশে টেলিভিশনে প্রচারিত ‘তিনি’ অনুষ্ঠানের একটি পর্বে বিশিষ্ট আইনজীবী ও রাজনীতিক ড. কামাল হোসেন অতিথি ছিলেন। অনুষ্ঠানটির বৈশিষ্ট্য ছিল শুধু অতিথির জীবনী তুলে ধরা নয়, বরং তার আদর্শ, ব্যক্তিজীবন ও পেশাগত সিদ্ধান্ত নিয়েও আলোচনা করা।
অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘এক্সপ্লোসিভ’-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন কাজী জেসিন। বর্তমানে তিনি এসব কাজের পাশাপাশি লেখালেখিতেও সক্রিয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন জাতীয় ইস্যু, রাজনীতি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে তিনি লিখেছেন।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের অধিকার নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে সক্রিয় ছিলেন কাজী জেসিন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ‘জার্নালিস্টস ফর জাস্টিস’ নামে একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। সংগঠনটির আহ্বায়ক ছিলেন কাজী জেসিন। ওই সংগঠনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল আগের সরকারের সময়ে নির্যাতন, নিপীড়ন, মামলা, হামলা ও হয়রানির শিকার সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের তালিকা তৈরি করা এবং তাদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের জন্য কাজ করা।
ওই উদ্যোগে কাজী জেসিন বলেছিলেন, সাংবাদিকদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যরাও মামলা, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিককে দেশ ছাড়তে হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সংগঠনটি একই সঙ্গে পেশাদার সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছিল।
গণমাধ্যম সংস্কার নিয়েও বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নিয়েছেন কাজী জেসিন। ২০২৫ সালে গণমাধ্যম সংস্কার নিয়ে আয়োজিত একটি আলোচনায় তাকে সাংবাদিক হিসেবে অংশ নিতে দেখা যায়। সেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও পেশাগত পরিবেশ নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়েও কাজী জেসিনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ২০২৫ সালে বাংলা একাডেমির কার্যক্রমে গুণগত পরিবর্তন ও সংস্কারের জন্য সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় যে ১৯ সদস্যের কমিটি গঠন করে, সেই কমিটির সদস্য ছিলেন কবি ও সাংবাদিক কাজী জেসিন। কমিটিতে লেখক, গবেষক, কবি, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদদের পাশাপাশি তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
অর্থাৎ সাংবাদিকতা থেকে টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ, রাজনৈতিক টকশো থেকে অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান, লেখালেখি থেকে গণমাধ্যম সংস্কার—বিভিন্ন ক্ষেত্রের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে নতুন বিটিভি মহাপরিচালকের।
কাজী জেসিনের নতুন দায়িত্ব তাই তার পেশাগত জীবনের একটি বড় পরিবর্তন। এতদিন তিনি মূলত সংবাদ ও অনুষ্ঠান নির্মাণের মাঠে ছিলেন; এবার তাকে পরিচালনা করতে হবে দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের সামগ্রিক কার্যক্রম।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক হিসেবে তার দায়িত্বের পরিধি ব্যাপক। বিটিভির সংবাদ ও অনুষ্ঠান, প্রযোজনা, সম্প্রচার, আঞ্চলিক কেন্দ্র, প্রযুক্তি, জনবল ব্যবস্থাপনা এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্রচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তার দায়িত্বের আওতায় থাকবে। একই সঙ্গে বদলে যাওয়া দর্শকচাহিদা, বেসরকারি টেলিভিশনের প্রতিযোগিতা, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের যুগে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে আরও কার্যকর ও দর্শকবান্ধব করার চ্যালেঞ্জও তার সামনে থাকবে।
বিশেষ করে বর্তমান সময়ে দর্শকের সংবাদ ও বিনোদন গ্রহণের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। টেলিভিশনের পাশাপাশি মানুষ এখন ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে খবর ও অনুষ্ঠান দেখছে। ফলে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের জন্য কেবল প্রচলিত সম্প্রচার কাঠামো ধরে রাখা নয়, ডিজিটাল দর্শকের কাছেও কার্যকরভাবে পৌঁছানো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।![]()
এই বাস্তবতায় দীর্ঘদিন টেলিভিশন সাংবাদিকতা ও অনুষ্ঠান নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত একজন পেশাজীবীর বিটিভির নেতৃত্বে আসা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, উপস্থাপনা, সংবাদ ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা বিটিভির অনুষ্ঠান ও সংবাদ কাঠামোতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
কাজী জেসিনের পেশাগত জীবনের আরেকটি দিক হলো চাপ ও বিতর্কের মধ্যেও সাংবাদিকতা চালিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা। ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’ ঘিরে হুমকি পাওয়া থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রকাশ্য অবস্থান—তার ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে এসব বিষয় সামনে এসেছে। ২০০৯ সালে হুমকির ঘটনায় তিনি আইনগত পদক্ষেপও নিয়েছিলেন।
২০১৯ সালে সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য পাওয়া পুরস্কারের ক্ষেত্রেও তার দীর্ঘ পেশাগত পথচলা এবং টেলিভিশন সাংবাদিকতায় অবদানের কথা তুলে ধরা হয়েছিল।
সব মিলিয়ে কাজী জেসিনের বিটিভির মহাপরিচালক পদে নিয়োগ তার দীর্ঘ গণমাধ্যম ক্যারিয়ারের একটি নতুন অধ্যায়। একজন সাংবাদিক ও অনুষ্ঠান নির্মাতা হিসেবে যে অভিজ্ঞতা তিনি দুই দশকের বেশি সময়ে অর্জন করেছেন, এবার সেই অভিজ্ঞতাই তাকে কাজে লাগাতে হবে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম পরিচালনায়।
যোগদানের তারিখ থেকে এক বছর মেয়াদি এই দায়িত্বে বিটিভিকে কতটা আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক, দর্শকনির্ভর এবং পেশাদার সম্প্রচারমাধ্যম হিসেবে এগিয়ে নিতে পারেন—সেটিই এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
এ সংস্করণে জীবনীমূলক তথ্যের পাশাপাশি তার সাংবাদিকতা, ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে ভূমিকা, পুরস্কার এবং সাম্প্রতিক কার্যক্রম যুক্ত করা হয়েছে।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব