গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ নয়, সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায় সরকার: তথ্যমন্ত্রী
প্রতিবেদক, এইএসএ বাংলা নিউজ
গণতন্ত্রকে টেকসই করতে স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, অতীতের মতো গণমাধ্যমের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ বা চাপ নেই। সরকার গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে কার্যকর নীতিমালার মাধ্যমে একটি সুস্থ ও টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায়।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা শক্তিশালী করতে স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম বিকশিত হওয়ার জন্যও একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রয়োজন। এ দুটি বিষয়কে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে।
তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের বিকাশে স্বাধীন সাংবাদিকতার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের ওপর সরকারের পক্ষ থেকে অতীতের মতো কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সরকার বিশ্বাস করে, একটি টেকসই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য।’
গণমাধ্যমের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অতীতে যে উদ্বেগ ছিল, বর্তমান বাস্তবতায় সেই পরিস্থিতি নেই বলেও দাবি করেন জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, সেমিনারে অংশ নেওয়া আলোচকেরাও সরকারের বর্তমান অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণ ও মতামত সরকারপ্রধানের কাছে তুলে ধরবেন বলেও জানান তিনি।
গণমাধ্যমকে শুধু সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, এটি একই সঙ্গে একটি শিল্প। এ খাতে বিনিয়োগ, পরিচালনা ও মুনাফার বিষয় রয়েছে। তবে ব্যবসায়িক বিবেচনার পাশাপাশি গণমাধ্যমের জনস্বার্থ রক্ষা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, গণমাধ্যম খাতকে এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে, যেখানে মালিক, সাংবাদিক, বিজ্ঞাপনদাতা ও সরকারের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হয়। এর মাধ্যমে একদিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোও টেকসইভাবে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের পরিসর আগের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত ও জটিল হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন তথ্যপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। প্রযুক্তিটির দ্রুত বিকাশ সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই, তৈরি ও পরিবেশনের প্রচলিত পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। তাই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে গণমাধ্যমের নতুন সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে হবে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘গণমাধ্যমের ইকোসিস্টেম এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। প্রচলিত সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যা তথ্যপ্রবাহ ও সংবাদ পরিবেশনের ধরন বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে নতুন প্রজন্মের গণমাধ্যম গড়ে তোলার সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।’
সরকার গণমাধ্যম খাতের জন্য নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং কার্যকর নীতিমালার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চায় বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, গণমাধ্যমের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি সাংবাদিকদের বেতন-কাঠামো, কর্মপরিবেশ ও পেশাগত নিরাপত্তার উন্নতিও সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, ‘সরকার গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং কার্যকর নীতিমালার মাধ্যমে একটি সুস্থ ও টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায়। এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে পারলে গণমাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়বে, সাংবাদিকদের জন্য উন্নত বেতন-কাঠামো, কর্মপরিবেশ ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।’
সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, এ পেশার মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তবে এ দায়িত্ব শুধু সরকারের পক্ষে এককভাবে পালন করা সম্ভব নয়। গণমাধ্যমের মালিক, সাংবাদিক, বিজ্ঞাপনদাতা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তারকে চিহ্নিত করেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, দ্রুতগতির তথ্যপ্রবাহের এই সময়ে সঠিক তথ্যের সঙ্গে অপতথ্যের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। ফলে সাংবাদিকদের জন্য তথ্য যাচাই, নির্ভুলতা ও বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চিত করা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘বর্তমানে সবচেয়ে বড় লড়াই হচ্ছে সঠিক তথ্য ও অপতথ্যের মধ্যে। তাই বস্তুনিষ্ঠ, নির্ভুল ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা পালন করাও সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।’
তিনি বলেন, প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গণমাধ্যমকেও নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তির সুযোগ কাজে লাগানোর পাশাপাশি এর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলায়ও সাংবাদিকদের দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন।
তথ্যমন্ত্রীর মতে, স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার সমন্বয়ই ভবিষ্যতের গণমাধ্যমের ভিত্তি হতে পারে। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও সমাজের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে একটি শক্তিশালী গণমাধ্যমব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।