বঙ্গভবনের সেই রুদ্ধশ্বাস ঘণ্টা ও বেগম জিয়ার মুক্তি
হেলাল উদ্দিন
৫ আগস্ট ২০২৪। ঘড়িতে তখন বিকেল। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর পুরো দেশ তখন এক চরম অনিশ্চয়তায়। ঠিক সেই মুহূর্তে বঙ্গভবনের দরবার হলে বসলো এক ঐতিহাসিক বৈঠক।
একদিকে দেশের তিন বাহিনীর প্রধান, অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা।
টেবিলে তখন সবচেয়ে বড় এজেন্ডা—বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি। কেমন ছিল সেই মুহূর্ত? শুনবো তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের জবানিতে।
সাবেক রাষ্ট্রপতির গুলশানস্থ বাসভবনে নিজের ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে প্রায় আড়াই ঘণ্টা ব্যাপী আড্ডা কালে তাঁর কাছ থেকে কিছু চমকপ্রদ তথ্য পেয়ে যাই। আমি প্রশ্ন করেছিলাম, ৫ আগস্টের সেই বিকেলে বঙ্গভবনের পরিবেশ কেমন ছিল? বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির সিদ্ধান্তটি ঠিক কীভাবে এলো?
সাবেক রাষ্ট্রপতি: (গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে) পরিবেশটা ছিল চরম উত্তেজনা এবং একই সাথে এক ধরনের শূন্যতার।
শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের দায়িত্ব তখন আমার কাঁধে।
আমি তখন তিন বাহিনীর প্রধান এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের জরুরি বৈঠকে ডাকলাম। সবাই এলেন।
আমার মনে আছে, মির্জা ফখরুল ইসলাম প্রথম সারির ডান দিকের কোনায় বসেছিলেন। তাঁর পর বসা ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির এবং অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারা। আমার কাছাকাছি অন্য পাশে বসেছিলেন চরমোনাই পীর এবং এরপর আসিফ নজরুল ও জোনায়েদ সাকি।
আর ঠিক তাঁদের উল্টো দিকে ডিজিএফআই প্রধান, তিন বাহিনীর প্রধান এবং কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্মকর্তা বসা ছিলেন।
টেবিলে বসার পর প্রথম এবং অন্যতম প্রধান দাবিটাই তুললেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব।
ফখরুল সাহেব ঠিক কী বলেছিলেন আপনাকে? তাঁর দাবির ভাষা কেমন ছিল?
সাবেক রাষ্ট্রপতি: মির্জা ফখরুল সাহেব অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে আমাকে বললেন—”মাননীয় রাষ্ট্রপতি, দেশে এক নতুন সূর্য উদিত হয়েছে। এই মুহূর্তে দেশের কোটি কোটি মানুষের নেত্রী, গণতন্ত্রের প্রতীক বেগম খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে বন্দি রাখা আর এক মুহূর্তও মেনে নেওয়া যায় না। তাঁকে অবিলম্বে, এই রাতেই নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।
“তাঁর এই দাবিতে কক্ষে উপস্থিত ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক এবং অন্যান্য দলের নেতারাও একযোগে হাত তুলে সমর্থন জানালেন।
আমি নিজেও খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে একমত ছিলাম। তাই দ্বিধা না করে তাৎক্ষণিক সম্মতি দিলাম।
এরপর ডিজিএফআই প্রধান পুরো ঢাকা শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিশেষ করে বিভিন্ন থানাগুলোতে যে ভয়াবহ হামলা ও অস্ত্র লুটপাট হচ্ছিল, সেই খবরগুলো টেবিল সবার সামনে তুলে ধরেন।
বৈঠকে ডিজিএফআই প্রধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমার এবং উপস্থিত সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন।
তিনি হাইপ্রোফাইল ব্যক্তিদের দেশ ছাড়ার প্রসঙ্গটি তুললেন। আক্ষেপ করে বললেন যে, এই চরম মুহূর্তেও ভিআইপি মানুষজন দেশ ছেড়ে বিমানে করে পালিয়ে যাচ্ছে।
ডিজিএফআই প্রধানের এই কথা শুনে বৈঠকে বসা বিমানবাহিনী প্রধান অবিলম্বে দেশের পুরো আকাশসীমা বন্ধ করার নির্দেশ দেন এবং জানান যে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কোনো বিমানকেই উড্ডয়নের অনুমতি দেওয়া হবে না।
সব মিলিয়ে সেই সন্ধ্যার কয়েকটা ঘণ্টা বঙ্গভবনের ওই কক্ষের বাতাস কতটা ভারী আর সিদ্ধান্তগুলো কতটা দ্রুত নিতে হয়েছিল, তা আজ দুই বছর পর বসে কল্পনা করাও কঠিন।”
আমি বৈঠকের শেষে আমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলাম। জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এখন যেহেতু রাত, এখন তো অর্ডার করার সুযোগ নেই। আগামীকাল সকালেই বিষয়টি কার্যকর করা হবে।
এরপর আমি দুটি সিদ্ধান্ত নেবো। রাজবন্দীদের মুক্তি—পহেলা জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত যারা কারাবন্দী ছিলেন, বিভিন্ন মামলায় আসামি ছিলেন, একই সাথে জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করব।”
৫ আগস্টের রাতের সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর আসে ৬ আগস্টের ঐতিহাসিক সকাল। সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের কর্মঘণ্টা শুরুই হয়েছিল এক চরম রাজনৈতিক ও মানবিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে—যা ছিল বেগম খালেদা জিয়ার সম্পূর্ণ ও তাৎক্ষণিক মুক্তির আদেশ।
সাবেক রাষ্ট্রপতি অত্যন্ত স্পষ্ট করে জানালেন সেই সকালের পর্দার আড়ালের ঘটনা। তিনি ঘড়ির কাঁটা ধরে কাজ শুরু করেন।
আমি সকালে অফিসে বঙ্গভবনে আমার দপ্তরে এসেই স্বরাষ্ট্র সচিবকে বেগম খালেদা জিয়ার নথিসহ তলব করি। একই সাথে আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে তলব করে সকাল ১০ টায় আমরা বসে মুক্তির জন্য চূড়ান্ত আদেশ তৈরি করলাম।
আমি বেলা ১১ টায় সে আদেশে স্বাক্ষর করলাম। এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।”
একই সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার ওপর থাকা সকল দণ্ডবিধি মওকুফের নির্দেশ দেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে ছিল সম্পূর্ণ নজিরবিহীন।
এই নির্দেশ দেওয়ার মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া সম্পূর্ণ মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেন এবং এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন চিকিৎসার জন্য।
আমি প্রশ্ন করলাম, “রাষ্ট্রপতির কি এতো ক্ষমতা? একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে কি তিনি তাৎক্ষণিক মুক্তি দিতে পারেন?
“মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ভাই হেসে উঠলেন। বললেন, “বাস্তবতা ভিন্ন। আসলে প্রধানমন্ত্রী নেই, সংসদ ভেঙে দিয়েছি। তখন একমাত্র আমি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের একমাত্র আইনি আর কেউ ছিল না।
আমি যদি মুক্তির জন্য আবেদন গ্রহণ করতাম, দীর্ঘ সময় লাগত। কিন্তু আমি তাৎক্ষণিক নিজের বিবেচনায়, সবার দাবি অনুযায়ী খালেদা জিয়াকে মুক্তির সিদ্ধান্ত নেই। এতে সংবিধান লঙ্ঘন হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না
আমি সাবেক রাষ্ট্রপতিকে প্রশ্ন করলাম সংবিধানের ঠিক কোন ক্ষমতার বলে আপনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন?
সাবেক রাষ্ট্রপতি: বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে যেকোনো দণ্ড মওকুফ বা স্থগিত করার একক ও সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতা দেয়।
দেখুন, দেশের আইন এবং সংবিধান সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম। একজন সাবেক বিচারক হিসেবে আমি জানতাম, নিয়মিত আদালতের মাধ্যমে এই সাজা বাতিল করতে গেলে দিনের পর দিন, হয়তো মাসের পর মাস সময় লেগে যেত।
কিন্তু বাইরের পরিস্থিতি তখন আদালতের জন্য অপেক্ষা করার মতো ছিল না। দেশ তখন এক ক্রান্তিকালে। ফখরুল সাহেবের আহ্বানে এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমি আমার সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিলাম।
আমি বুঝলাম, এই মুহূর্তে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করতে এর চেয়ে বড় কোনো বিকল্প নেই। তাই আমি ফখরুল সাহেব এবং উপস্থিত সবাইকে আশ্বস্ত করে বললাম—”আমি আজ রাতেই জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবো।
সেখানে বেগম জিয়ার মুক্তির ঘোষণা থাকবে এবং আগামীকাল সকালের মধ্যেই কাগজের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তাঁকে মুক্ত করা হবে।”
আমি প্রশ্ন করলাম, ৬ আগস্ট দুপুরের মধ্যেই তো প্রজ্ঞাপন জারি হয়ে গেল। ১ ঘণ্টার নোটিশে এই মুক্তি কি শুধুই আইনি ছিল, নাকি এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক চাপও ছিল?
সাবেক রাষ্ট্রপতি: চাপ বলবো না, এটাকে বলা যায় গণদাবি। ৫ আগস্ট রাতে আমার ভাষণের পর ৬ আগস্ট সকালে আমি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়কে জরুরি ভিত্তিতে আদেশ প্রস্তুত করতে বলি।
আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন আমি যদি সেদিন সই না করতাম তবে কী হতো? আমি বলবো, সেদিন জনজোয়ার যেভাবে ফুঁসে উঠেছিল, এই আদেশের তোয়াক্কা না করেই হয়তো জনতা বেগম জিয়াকে হাসপাতাল থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসতো।
কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটি আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।
নিজের ভেতরের অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমি খুবই স্বস্তিবোধ করেছিলাম যে এই সিদ্ধান্তটি নিতে পেরেছি। বিএনপি নেত্রীকে মুক্তি দিতে পেরেছি। তার প্রতি অতীতে যে ধরনের আচরণ করা হয়েছে, আমি মনে করি তা কোনোভাবেই মানবিক ছিল না, সঠিক ছিল না।”
বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির পরপরই সাবেক রাষ্ট্রপতি হাত দেন আরেকটি জরুরি ফাইলে। জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে যারা আহত, নিহত, মামলা-হামলার শিকার কিংবা কারাবন্দী হয়েছিলেন—তাদের সকলের সাধারণ ক্ষমা ও মুক্তির আদেশে তিনি স্বাক্ষর করেন।
এই দুটি ঐতিহাসিক এবং স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত তিনি দুপুরের মধ্যেই সম্পন্ন করেছিলেন।
কিন্তু দেশের পরিস্থিতি তখনো শান্ত ছিল না। দুপুরের এই ঝড় সামলানোর পর সাবেক রাষ্ট্রপতি পা বাড়ান তার জীবনের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে স্পর্শকাতর আরেকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকে…
একটি দেশের সরকারপ্রধান যখন লিখিত কোনো পদত্যাগপত্র না রেখে আকস্মিক দেশত্যাগ করেন, তখন রাষ্ট্র এক গভীর সাংবিধানিক সংকটে নিমজ্জিত হয়।
৫ আগস্ট রাত থেকেই রাজপথ এবং আন্দোলনকারী ছাত্রদের পক্ষ থেকে প্রধান দাবি ছিল—অবিলম্বে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দিতে হবে।
সংকট উত্তরণের একমাত্র উপায়ও ছিল এটিই—জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা। কিন্তু এখানেই ছিল সবচেয়ে বড় আইনি জটিলতা।