কূটনৈতিক প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর। প্রথমবারের মতো ঢাকা সফরে এসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদারে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন সার্জিও গর। এর আগে তিন দিনের ভারত সফর শেষে বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি ঢাকায় পৌঁছান।
বৈঠক শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় সার্জিও গর বলেন, বাংলাদেশে তাঁর প্রথম সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি আনন্দিত। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কে ইতিমধ্যে অনেক ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ও বৈদেশিক নীতি নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। এটি কোনো একটি বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সব পর্যায়ে দুই দেশের যোগাযোগ ও সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে এবং তা আরও এগিয়ে যাচ্ছে।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে বাংলাদেশ যে সহায়তা পায়, তার অর্ধেকের বেশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে। তবে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগের বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়নি। ভবিষ্যতেও রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এ বিষয়ে খলিলুর রহমান বলেন, প্রথমে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ১৯ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে যে আইনের আওতায় ওই শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল, সেখানে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সর্বোচ্চ ১৫৫ দিনের জন্য ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ রয়েছে।
ওই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড অ্যাক্টের ৩০১ ধারার আওতায় নতুন করে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এর ফলে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ এবং কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে পোশাক তৈরি করে, তাহলে সেটিকে ‘ট্রান্সফর্মড আমেরিকান কটন’ হিসেবে বিবেচনা করা হলে ওই পণ্যের ওপর কেন শুল্ক আরোপ করা হবে।
এই আলোচনার পর বাংলাদেশকে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে এবং একটি ট্যারিফ কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। একই ধরনের সুবিধা এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশ পেয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আওয়ামী লীগ কিংবা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন খলিলুর রহমান।
মিয়ানমারে মানবিক করিডোর প্রতিষ্ঠার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো প্রস্তাব দিয়েছে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি।
সার্জিও গরের ঢাকা সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের ধারাবাহিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বাণিজ্য, রোহিঙ্গা সংকট, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আরও গভীর করার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।![]()