প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১৪:৪৫
দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে শুধু হাসপাতালের অবকাঠামো বাড়ানো বা শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি করলেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, চিকিৎসকদের সেবার মানসিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসকসহ পেশাজীবীদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকতে পারে, তবে সেই সম্পৃক্ততা যেন কোনোভাবেই পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে জাতীয় সংসদের এলডি হল প্রাঙ্গণে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
চিকিৎসকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রায় সব কাজকেই প্রভাবিত করে। ফলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা পেশাজীবীরা নিজ নিজ মতাদর্শ অনুযায়ী রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত বা সচেতন থাকবেন, সেটি অযৌক্তিক নয়। তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে যেন পেশাগত দায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, “একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেহেতু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রায় সকল কাজকে প্রভাবিত করে; সেহেতু শিক্ষার্থী-শিক্ষক কিংবা পেশাজীবী সবাই যার যার মতাদর্শ অনুসারে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত থাকবেন বা সচেতন থাকবেন, এটা অযৌক্তিক কোনো বিষয় নয়। তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন না ঘটায় বা বিঘ্ন ঘটার কারণ না হয়, সেটি হচ্ছে মোস্ট ইম্পোর্টেন্ট।”
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি জনবল ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি চিকিৎসকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, হাসপাতাল তৈরি, শয্যা বাড়ানো কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করলেই স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত হবে না। রোগীদের প্রতি চিকিৎসকদের দায়িত্বশীলতা, মানবিকতা ও সেবার মানসিকতাই শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থার সফলতা নির্ধারণ করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, চিকিৎসকগণ যদি সেবার মানসিকতা নিয়ে নিজেদেরকে নিবেদিত না রাখেন; তাহলে এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে কিন্তু আমাদের সফলতা আসবে না।”
চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আরও যত্নশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত অবহেলা কিংবা দায়িত্ব পালনে শিথিলতার কারণে শুধু একজন চিকিৎসক নয়, পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেই মানুষের কাছে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। এতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ নিয়েও মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
চিকিৎসকদের আরও মানবিক ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রোগীরা চিকিৎসকদের কাছে শুধু চিকিৎসা নিতে যান না, তাঁরা আস্থা ও নির্ভরতার জায়গা হিসেবেও চিকিৎসকদের দেখেন। ফলে চিকিৎসকদের আচরণ, দায়িত্ববোধ এবং রোগীদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসকদের বিভিন্ন দাবির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ ব্যবস্থায় চিকিৎসক নিয়োগ, চিকিৎসকদের চাকরিতে বয়সসীমা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন প্রণয়নসহ বিভিন্ন দাবিকে চিকিৎসকদের অবস্থান থেকে বিবেচনা করলে অযৌক্তিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে এসব দাবি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের বাস্তব সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি ছিল দুর্বল। প্রশাসনে বিভাজন ছিল এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাও ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। এই পরিস্থিতির মধ্যেই সরকার বিভিন্ন খাতকে পুনর্গঠন ও কার্যকর করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তখন দেশকে একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। অর্থনৈতিক দুর্বলতার পাশাপাশি প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা সংকট ছিল। এসব সংকট কাটিয়ে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আধুনিক, কার্যকর ও মানুষের জন্য সহজলভ্য করার কাজ চলছে।
স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দের বিষয়েও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, স্বাস্থ্য খাতকে আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে এবার এ খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলা নয়, ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা।
হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সমন্বিত ও আধুনিক করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জনগণের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য ও চিকিৎসাসেবাকে একটি কার্যকর ব্যবস্থার আওতায় আনার মাধ্যমে সেবার মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
এদিকে দেশের চলমান জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রশাসনে অতীতের সুবিধাভোগীরা এখনো সক্রিয় রয়েছে। একটি চক্র সুকৌশলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে এবং বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, “প্রশাসনে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা কিন্তু বসে নেই। সাম্প্রতিক সময়ে আপনারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, একটি চক্র খুব সুকৌশলে জ্বালানি কিংবা বিদ্যুৎ সেক্টরকে অস্থিতিশীল করার জন্য সক্রিয়।”
তবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি সরকার অস্বীকার করছে না বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে অতীতে নেওয়া বিভিন্ন অপরিকল্পিত পরিকল্পনা ও নীতির প্রভাব রয়েছে। নির্দিষ্ট মহলকে সুবিধা দিতে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের খেসারত এখন দেশের মানুষ ও সরকারকে দিতে হচ্ছে।
জ্বালানি খাতের সংকট থেকে উত্তরণে সরকার কাজ শুরু করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, অতীতে নেওয়া অপরিকল্পিত পরিকল্পনাগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি খাতকে ধীরে ধীরে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বনির্ভর করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। শুধু তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান নয়, দীর্ঘমেয়াদে দেশের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সরকার যেমন দায়িত্ব পালন করবে, তেমনি চিকিৎসকদেরও নিজেদের দায়িত্বের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে হবে। সরকারি উদ্যোগ ও চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্ববোধ—দুইয়ের সমন্বয়েই একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
তিনি বলেন, জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে চিকিৎসাসেবায় জবাবদিহি, মানবিকতা ও পেশাদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসকদের আচরণ ও সেবার মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সমাবেশের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান এলডি হল প্রাঙ্গণে দুটি বৃক্ষরোপণ করেন। পরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। তাঁরা কবুতর ও বেলুন উড়িয়ে সমাবেশের উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত: সংকট থেকে সমাধান’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডা. মোস্তফা আদিব সুমন। ‘জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উত্থান’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাইফ মোহাম্মদ।
ড্যাব সভাপতি হারুন আল রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার এবং ড্যাবের মহাসচিব জহিরুল ইসলাম শাকিল বক্তব্য দেন।
চিকিৎসক সমাবেশে স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সংকট, চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্ব, চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন এবং সরকারের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি চিকিৎসকদের বিভিন্ন দাবি ও প্রত্যাশার বিষয়ও উঠে আসে।
সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে সরকারের স্বাস্থ্য খাতের পরিকল্পনার পাশাপাশি চিকিৎসকদের দায়িত্বের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। রাজনৈতিক মতাদর্শ বা সম্পৃক্ততা ব্যক্তিগত অধিকার হলেও সেটি যেন রোগীর সেবা ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের ওপর প্রভাব না ফেলে—এই বার্তাই চিকিৎসকদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, সেবার মানসিকতা, দায়িত্বশীলতা, মানবিক আচরণ ও পেশাগত জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। সরকারের পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও চিকিৎসকদের দায়িত্বশীল ভূমিকার সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।