চট্টগ্রামের ২০০ বন্ধ কারখানা চালু হলে ১০ লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্ধ বা বন্ধের উপক্রম হওয়া প্রায় ২০০ শিল্প-কারখানা পুনরায় চালু করা গেলে প্রায় ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনে ফেরানো গেলে বিপুল পরিমাণ আটকে থাকা ঋণও আদায়ের সুযোগ তৈরি হবে। তবে শিল্প পুনরুদ্ধারের পথে জ্বালানি সংকট, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ঘাটতি এবং দক্ষ পরিচালনাকারীর অভাবকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিসে গতকাল অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় উপস্থাপিত একটি ধারণাপত্রে এ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়। ‘এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য: চট্টগ্রাম অঞ্চলের সম্ভাবনা’ শীর্ষক এ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
ধারণাপত্রে বলা হয়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রায় ২০০ শিল্প-কারখানা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে অথবা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এসব কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ কর্মী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি বা অবাণিজ্যিক ঋণে পরিণত হয়েছে। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় সচল করা গেলে একদিকে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হবে, অন্যদিকে ব্যাংক খাতের আটকে থাকা ঋণ পুনরুদ্ধারের পথও তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিসের নির্বাহী পরিচালক মো. হানিফ মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম।
সভায় উপস্থাপিত ধারণাপত্রে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামষ্টিক অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও ব্যাংক খাতের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরে সেগুলো কাটিয়ে ওঠার একটি সম্ভাব্য রূপরেখা দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, জাতীয় অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট রফতানির প্রায় ১৮ শতাংশ, আমদানির ২১ শতাংশ এবং রেমিট্যান্সের ২৮ শতাংশ এ অঞ্চল থেকে আসে। একইভাবে দেশের মোট আমানতের ১৯ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং মোট ঋণের ১৮ দশমিক ৫ শতাংশের জোগানও আসে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে।
এ অবস্থায় চট্টগ্রামের শিল্প খাতের স্থবিরতা শুধু আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্য নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনে ফিরলে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, রফতানি ও ব্যাংক ঋণ পুনরুদ্ধার—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ নীতির কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদন ও উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
চট্টগ্রামের সম্ভাবনাময় খাতগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ শর্তে অর্থায়নের ওপরও গুরুত্ব দেন গভর্নর। তিনি ব্লু-ইকোনমি, সামুদ্রিক সম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং মানবসৃষ্ট তন্তু বা ম্যানমেড ফাইবার খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান জানান। এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে নতুন শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিদেশগামী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেন গভর্নর। তিনি বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের অদক্ষ হিসেবে বিদেশে পাঠানোর পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট দেশের নির্দিষ্ট শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষিত করে পাঠাতে হবে। একই সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের কার্যক্রম আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় নগদনির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর বিষয়েও সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। গভর্নর বাংলা কিউআরের সম্প্রসারণের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন ত্বরান্বিত এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, নগদবিহীন লেনদেনের পরিধি বাড়াতে পারলে অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক খাতে লেনদেন বৃদ্ধি এবং আর্থিক সেবার আওতা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
ব্যাংক খাতের শাসন ও জবাবদিহির বিষয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানান গভর্নর। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না। ব্যাংকের অনিয়মের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ করে পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শকদের নির্দেশ দেন তিনি।
চট্টগ্রামের শিল্প খাতের পুনরুদ্ধারে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো অর্থায়ন। ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির অভাব শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম প্রধান সমস্যা। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে ফেরার সক্ষমতা রাখলেও পর্যাপ্ত কার্যকরী মূলধন ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অভাবে পুনরায় চালু হতে পারছে না। এর সঙ্গে রয়েছে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনাকারীর ঘাটতি।
এ কারণে শুধু ঋণ পুনঃতফসিল বা নতুন করে অর্থায়ন করলেই বন্ধ কারখানাগুলোকে সচল করা সম্ভব হবে না বলে ধারণাপত্রে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা, বাজার সম্ভাবনা, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, জ্বালানি সরবরাহ এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও চাপের মধ্যে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম আরও বাড়াতে হবে।
তিনি আর্থিক ও আয়বৈষম্য কমানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের শিল্প, বাণিজ্য ও বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। দেশের আমদানি-রফতানি কার্যক্রমের বড় অংশ এ অঞ্চলনির্ভর হওয়ায় এখানকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির গতি সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে বন্ধ কারখানাগুলোকে উৎপাদনে ফেরানোর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এর সুফল শুধু সংশ্লিষ্ট শ্রমিক বা উদ্যোক্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ব্যাংক, সরবরাহকারী, পরিবহন, বন্দর, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ভোক্তা—অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে এর প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারণাপত্রে উঠে আসা ১০ লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তাই চট্টগ্রামের শিল্প পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে একটি বড় অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বন্ধ কারখানার কারণগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত করে কার্যকর পুনর্বাসন পরিকল্পনা নিতে হবে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং ব্যাংক ঋণের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান ছাড়া বিপুলসংখ্যক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে টেকসইভাবে উৎপাদনে ফেরানো কঠিন হবে।
চট্টগ্রামের প্রায় ২০০ বন্ধ বা সংকটাপন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে যদি উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে একদিকে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে ব্যাংক খাতে আটকে থাকা বিপুল ঋণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও বাড়বে। একই সঙ্গে রফতানি ও আমদানি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত শিল্পের সক্ষমতা বাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতেও নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে।![]()