বাংলাদেশে নতুন ব্যাংকনোট মুদ্রণের খরচ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নোট মুদ্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যয় হয়েছে ৪৫৮ কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ২৩৪ কোটি ৭৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ব্যয় বেড়েছে ২২৪ কোটি ১৪ লাখ ৮ হাজার টাকা বা ৯৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রা ব্যবস্থাপনার নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পুরোনো ও ব্যবহারের অনুপযোগী নোট বাজার থেকে তুলে নিয়ে তার পরিবর্তে নতুন নোট ছাপানো হয়। দেশে এ কাজটি করে দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড।
নোট মুদ্রণের ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপত্তা কাগজ, বিশেষায়িত কালি ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়াকে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব উপকরণের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিশ্বজুড়ে খুবই সীমিত। ফলে দরপত্র বা ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরবরাহকারীদের সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগও তুলনামূলক কম। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নও ব্যয় বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
তবে নোট ছাপানোর পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণে এ ব্যয় বৃদ্ধি হয়নি বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন নোট মুদ্রণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় খুব বেশি বাড়েনি। অর্থাৎ মূলত নোট তৈরির উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিই ব্যয় বাড়ার বড় কারণ।
গত কয়েক বছরের হিসাবেও নোট মুদ্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের উল্লেখযোগ্য ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৩৮৪ কোটি ২৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা। ২০২২-২৩ সালে ৩৭৪ কোটি ৩ লাখ ৮৫ হাজার এবং ২০২৩-২৪ সালে ৩৩৭ কোটি ২৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা ব্যয় হয়। ২০২৪-২৫ সালে ব্যয় আরও কমে দাঁড়ায় ২৩৪ কোটি ৭৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। এরপর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা এক লাফে বেড়ে ৪৫৮ কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। ফলে গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ নোট মুদ্রণ ব্যয় হয়েছে সর্বশেষ অর্থবছরে।
নোট মুদ্রণের উপকরণ বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হওয়ায় বিনিময় হারও ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। তবে গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন শেষে আন্তব্যাংক গড় বিনিময় হার ছিল প্রতি ডলারে ১২২ টাকা ৭৭ পয়সা। ২০২৬ সালের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২২ টাকা ৮৫ পয়সায়। অর্থাৎ এক বছরে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে মাত্র ৮ পয়সা বা প্রায় শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। ফলে এবার মুদ্রণ ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিনিময় হারের চেয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কাগজ, কালি ও অন্যান্য উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবই বেশি।
এরই মধ্যে দেশের ব্যাংকনোটের নকশা পরিবর্তনের কাজও এগিয়ে চলছে। নতুন নকশার নোট বাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর। তবে নোটের নকশা পরিবর্তনের খরচ বর্তমান ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ নয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন নকশার জন্য ব্যয় তুলনামূলক কম; কাগজ, কালি ও অন্যান্য নিরাপত্তা উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়াই মুদ্রণ ব্যয়ের বড় কারণ।
নোটের নকশা পরিবর্তনের পাশাপাশি পুরোনো নকশার নোট ধীরে ধীরে বাজার থেকে তুলে নেওয়া হবে। ফলে আগামী দিনগুলোতে নতুন নোট মুদ্রণের প্রয়োজনীয়তা বাড়তে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একসঙ্গে সব পুরোনো নোট বদলে ফেলবে না; বাজারের চাহিদা ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে নতুন নোট সরবরাহ করা হবে।
কাগুজে নোট ব্যবস্থাপনার ব্যয় কমাতে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল পরিশোধব্যবস্থা সম্প্রসারণ করছে। নগদ লেনদেনের ব্যবহার কমানো গেলে দীর্ঘ মেয়াদে নোট ছাপানো, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং অচল নোট ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত ব্যয়ও কমানো সম্ভব হবে।![]()