জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে অপ্রত্যাশিত দুর্বলতার চিত্র দেখা গেছে। মাসটিতে দেশটিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হয়ে উল্টো ২৩ হাজার কমেছে। অথচ অর্থনীতিবিদেরা জুলাইয়ে ৯৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে শ্রমবাজারের গতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেকারত্বের হার সামান্য কমেছে। জুনে ৪ দশমিক ২ শতাংশ থাকা বেকারত্বের হার জুলাইয়ে নেমে এসেছে ৪ দশমিক ১ শতাংশে। ফলে মার্কিন শ্রমবাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের পরস্পরবিরোধী চিত্র। একদিকে নতুন চাকরি সৃষ্টি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম, অন্যদিকে বেকারত্বের হার এখনো তুলনামূলকভাবে নিচু পর্যায়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিকে সরাসরি মার্কিন অর্থনীতিতে মন্দার পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমবাজারে নিয়োগের প্রবণতা দুর্বল হলেও ব্যাপক ছাঁটাইয়ের লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
জুলাইয়ের কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হলো আগের মাসগুলোর পরিসংখ্যান সংশোধন। মে ও জুনে যুক্তরাষ্ট্রে যত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল বলে আগে ধারণা করা হয়েছিল, সংশোধিত হিসাবে তা মোট ১ লাখ ৩ হাজার কম। অর্থাৎ শ্রমবাজারের দুর্বলতা শুধু জুলাইয়ের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়; আগের দুই মাসের তথ্যেও পরিস্থিতি আগের ধারণার চেয়ে দুর্বল ছিল।
তবে মার্কিন অর্থনীতির সামগ্রিক শক্তি এখনো যথেষ্ট। প্রায় ৩১ ট্রিলিয়ন ডলারের এই অর্থনীতিতে ভোক্তা ব্যয় এখনো গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। যুদ্ধ, শুল্কনীতি এবং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখনো বড় ধরনের মন্দায় পড়েনি।
তারপরও শ্রমবাজারের কিছু দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বেকারত্বের হার কমে যাওয়াকেও সরলভাবে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন না অর্থনীতিবিদেরা। কারণ, চাকরির বাজার থেকে অনেকে সরে যাওয়ায় তাঁরা আর বেকার হিসেবে পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন না। অর্থাৎ বেকারত্বের হার কমলেও কর্মসংস্থানের বাজারে মানুষের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ। মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় বা আয় দিয়ে প্রকৃতপক্ষে যত পণ্য ও সেবা কেনা যায়, সেই সক্ষমতা চাপের মুখে রয়েছে। আবাসন, শিশুর যত্ন এবং অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয়ের উচ্চমূল্য অনেক মার্কিন পরিবারের আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে। ফলে কর্মসংস্থান থাকলেও মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তি আগের মতো নেই।
খাতভিত্তিক পরিসংখ্যানেও দুর্বলতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। অবকাশ ও আতিথেয়তা খাতে জুলাইয়ে কর্মসংস্থান কমেছে। সাধারণত বড় ধরনের ক্রীড়া আয়োজন বা বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক আয়োজনকে ঘিরে এ ধরনের খাতে চাকরি বাড়ার প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু এবার সেই প্রত্যাশার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে।
এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারও মার্কিন শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে কোন কোন পেশায় মানুষের চাহিদা কমবে এবং নতুন কোন ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি হবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। এরই মধ্যে কিছু কর্মী প্রযুক্তির প্রভাব থেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পেশায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
জুলাইয়ের দুর্বল কর্মসংস্থান প্রতিবেদন এখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমবাজার দুর্বল হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সুদের হার কমানোর চাপ বাড়তে পারে। তবে শুধু একটি মাসের কর্মসংস্থান প্রতিবেদন দেখে নীতিনির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। মূল্যস্ফীতি, মজুরি বৃদ্ধি, ভোক্তা ব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ একাধিক সূচক বিবেচনায় নিতে হবে।
আরেকটি বিষয় হলো, কর্মসংস্থানের এই পরিসংখ্যান পরবর্তী সময়ে আবার সংশোধিত হতে পারে। ফলে জুলাইয়ের সংখ্যা মার্কিন শ্রমবাজারের চূড়ান্ত চিত্র নয়। তারপরও আগের দুই মাসের পরিসংখ্যান সংশোধন এবং জুলাইয়ের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দুর্বল কর্মসংস্থান সৃষ্টি—দুটি বিষয়ই নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্ক সংকেত।
সব মিলিয়ে মার্কিন অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি এখনো শক্তিশালী। কিন্তু শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে আসা, মানুষের প্রকৃত আয় নিয়ে চাপ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো অর্থনীতির ভেতরে থাকা দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে আসছে। তাই এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এই দুর্বলতা সাময়িক, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার দীর্ঘমেয়াদি শ্লথতার দিকে যাচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিশ্বের বিপুলসংখ্যক দেশের বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত।
মার্কিন শ্রমবাজার দুর্বল হলে প্রথম যে প্রভাবটি পড়তে পারে, তা হলো ভোক্তা ব্যয়ে। কর্মসংস্থান ও আয় কমলে মার্কিন পরিবারগুলোর পণ্য ও সেবা কেনার সক্ষমতা কমতে পারে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি চাহিদা কমার ঝুঁকি তৈরি হবে। আর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আমদানিকারক হওয়ায় এর প্রভাব পড়তে পারে রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোতে।
বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান বাজার। মার্কিন ভোক্তা ব্যয় দীর্ঘ সময় দুর্বল থাকলে পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের চাহিদায় চাপ তৈরি হতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ও শিল্প উৎপাদনেও পরোক্ষ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য পরিস্থিতির আরেকটি দিক তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক হতে পারে। মার্কিন শ্রমবাজার দুর্বল হলে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর বিষয়ে আরও আগ্রহী হতে পারে। সুদের হার কমলে ঋণের ব্যয় কমার পাশাপাশি অর্থনীতিতে তারল্য বাড়তে পারে। এতে বিনিয়োগ ও ভোগ ব্যয় উৎসাহিত হওয়ার সুযোগ থাকে।
সুদের হার কমানোর প্রত্যাশা বৈশ্বিক আর্থিক বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার কমলে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দিকে বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এসব দেশের বৈদেশিক ঋণের ব্যয়ও কিছুটা কমতে পারে। একই সঙ্গে ডলারের বিনিময়মূল্যে চাপ তৈরি হলে অন্য দেশের মুদ্রার ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান কমার খবরটি একদিকে বৈশ্বিক পণ্যের চাহিদার জন্য সতর্কবার্তা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারের জন্য সম্ভাব্য স্বস্তির সংকেত। কোন প্রভাবটি শেষ পর্যন্ত বেশি শক্তিশালী হবে, তা নির্ভর করবে মার্কিন অর্থনীতি কত দ্রুত দুর্বল হচ্ছে এবং ফেডারেল রিজার্ভ তার নীতিতে কী পরিবর্তন আনে তার ওপর।
এ কারণে জুলাইয়ের কর্মসংস্থান প্রতিবেদনকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, মুদ্রাবাজার ও সুদের হারের গতিপথের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকেত। মার্কিন অর্থনীতি এখনো মন্দার মধ্যে না পড়লেও শ্রমবাজারে দুর্বলতার যে আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তা আগামী মাসগুলোর অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।![]()