সৌদি প্রতিনিধি
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১৭ বাংলাদেশি প্রবাসী নিহত হয়েছেন। কাজ চলার সময় হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে কারখানায় থাকা দাহ্য ফোম, কাপড় ও অন্যান্য সামগ্রীতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
স্থানীয় ও প্রবাসী সূত্রে জানা গেছে, রোববার রিয়াদের একটি এলাকায় ওই সোফা কারখানায় স্বাভাবিকভাবে কাজ চলছিল। এ সময় হঠাৎ কারখানার ভেতরে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রথমে আগুন সীমিত এলাকায় থাকলেও সেখানে থাকা ফোম, কাপড়, কাঠ ও সোফা তৈরির অন্যান্য দাহ্য সামগ্রীর কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তা ছড়িয়ে পড়ে।
আগুন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কারখানার ভেতর ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। কর্মরত শ্রমিকদের অনেকেই দ্রুত বের হওয়ার চেষ্টা করেন। তবে আগুনের তীব্রতা ও ধোঁয়ার কারণে সবাই সময়মতো কারখানা থেকে বের হতে পারেননি।
একপর্যায়ে আগুন কারখানার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ভেতরে আটকা পড়া শ্রমিকদের মধ্যে অনেকে ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে না পেরে গুরুতর অবস্থায় পড়েন। পরে ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ শুরু হলে একে একে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
খবর পেয়ে সৌদি ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তারা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি কারখানার ভেতরে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে অভিযান চালান। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
পরে কারখানার বিভিন্ন অংশ তল্লাশি করে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অন্তত ১৭ বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহত কয়েকজনকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আগুন কীভাবে শুরু হয়েছিল, বৈদ্যুতিক ত্রুটি ছিল কি না কিংবা কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে।
কারখানাটিতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, জরুরি বহির্গমন পথ ছিল কি না এবং শ্রমিকদের নিরাপদে বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি না—তদন্তে এসব বিষয়ও গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে নিহত বাংলাদেশিদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পরিচয় শনাক্ত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানা গেছে।
নিহতদের স্বজনদের কাছে খবর পৌঁছানোর পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারিয়ে অনেক পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
জানা গেছে, নিহতদের বেশির ভাগই জীবিকার তাগিদে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে নওগাঁসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা রয়েছেন। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে এবং স্বজনদের জন্য অর্থ উপার্জনের আশায় তারা সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন।
সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশ বিভিন্ন কারখানা, নির্মাণ, পরিবহন, পরিষেবা ও অন্যান্য শ্রমনির্ভর কাজে যুক্ত। কর্মস্থলে অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে ফোম, কাপড়, কাঠ ও রাসায়নিকজাতীয় দাহ্য উপকরণ ব্যবহৃত হয় এমন কারখানায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এই ঘটনায়ও আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে কারখানায় থাকা দাহ্য উপকরণের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং দুর্ঘটনার জন্য কোনো অব্যবস্থাপনা দায়ী কি না, তা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
এদিকে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারখানার ভেতরে কতজন শ্রমিক ছিলেন এবং তাদের মধ্যে কতজন নিরাপদে বের হতে পেরেছেন, তা যাচাই করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও সৌদি আরবের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বলে জানা গেছে। নিহত ও আহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা, মরদেহ দেশে ফেরত আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আগুনের প্রকৃত কারণ, কারখানাটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনার পেছনে কোনো অবহেলা ছিল কি না—এসব বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এদিকে একসঙ্গে এত বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যুতে সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যেও শোক নেমে এসেছে। নিহতদের স্বজন ও সহকর্মীরা দ্রুত মরদেহ দেশে পাঠানো এবং আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।